ধারাবাহিক উপন্যাস
ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান
(১৫)
প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধীরেন্দ্রনাথের স্কুল জমে উঠেছে। বাসন্তীর সঙ্গে সখ্যতা হয়েছে দিলীপের, যেন হওয়ারই কথা ছিল। ছাত্র জোগাড় করার কাজে দু-জনের মিলিত প্রয়াস অনেকখানি সফলতা এনেছে। অসচেতনভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরতা গাঢ় হচ্ছে। ভবিষ্যতে জল কতদূর গড়ায় সে চিন্তা আপাতত কালের গর্ভে। ক-মাস পর দিলীপ বলছিল, “বুজলেন দিদিমনিরা, ছাত্রসংখ্যা বারতাছে। নীচে বসাইয়া পড়ান আর সম্ভব হচ্ছে না। খানকয় টেবিল, চেয়ার, জোড়াবেঞ্চির বেবস্থা করা গ্যালে ভালো হইত। টাকা যা লাগব জোগার করতে হইব। বাসন্তী, ধীরেনস্যারকে একবার কইয়া দ্যাখবেন?”
বাসন্তীরও অনেকবার এই বিষয়ে ভাবনা মাথায় এসেছে। সে গম্ভীরমুখে মাথা নাড়ল। বলল,
“কাকাবাবুর শরীর ভাল থাকছে না। খুড়িমায়েও বড়ই ভাবনার মধ্যে আছে। এই অবস্থায় উনারে গিয়া
বলা কি ঠিক হইব?”
বাসন্তীর কথায় বাকি দুই শিক্ষিকা সমর্থন করল, যদিও নিজেদের মতামত বলে তাদের
বিশেষ কিছু নেই, থাকেও না। তারপর সকলে একমত হল, যদি পয়সাওয়ালা ভদ্র স্পনসর পাওয়া যায়
তবে স্কুলের স্বার্থে সেই টাকা নেওয়া যেতে পারে। দিলীপ পরামর্শ দিল অন্তত ঋণ হিসাবেও
যদি কেউ দিতে চায়, ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। উপযুক্ত সরঞ্জামের অভাব হলে পড়ানোর মান নেমে
যেতে বাধ্য। ছেলেপিলেরাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। কলকাতার কয়েকটি ভালো স্কুলের উদাহরণ দিল
দিলীপ। পরিচ্ছন্নতা, খেলার অঙ্গন, লাইব্রেরি, শ্রেণীকক্ষে বসার ব্যবস্থা – ভালো ছাত্র
পেতে গেলে উপযুক্ত পরিবেশ অবশ্য প্রয়োজন। তাদের নবগঠিত স্কুলে এখন এতসব সম্ভব নয়, কেউ
আশাও করে না। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনা রাখা প্রয়োজন।
ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি থেকে যাহোক কিছু খেয়ে আসে সকালে। সঙ্গে আনে বসার আসন, সেলাই-করা
একটা বা দুটো খাতা। স্কুলের পোশাক নেই, জুতো পায়ে থাকে না অনেকেরই। বই বগলদাবা করে
সাইকেলের টায়ার লোহার শিক বা গাছের সরু ডাল দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে এসে পৌঁছায়। একটু বড় বাচ্চারা
স্কুলে ঢুকেই মারামারি, ঠেলাঠেলি আরম্ভ করে। উদ্দাম, অসভ্য, অনিয়ন্ত্রিত বাঁধনছেঁড়া
বন্য পশুর মতো। বাসন্তী আর দিলীপ ধমক দেয়, দরকার মতো হাত কিম্বা সরু লাঠির দু-চার ঘা
পিঠে বসিয়ে দেয়।
মোটামুটি দৈনিক রুটিন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথমে প্রার্থনা সঙ্গীত। সমস্বর
বেসুরো গান কানে তালা ধরিয়ে দিলেও ভালোই লাগে। তারপর ঠেলেঠুলে তাদের ক্লাসে পাঠানো,
নাম ডেকে গুনতি করা। অন্য স্কুলে কী ধরনের বই পাঠ্য, দিলীপ খোঁজ নিয়ে আসার পর সিলেবাস
তৈরি হয়েছে। একটা বড়ো সমস্যা অবশ্য আছে। দিলীপ মোটামুটি ভালো ইংরাজি জানে, কলকাতার
কলেজে পড়েছে। বাকি তিনজনের ইংরাজির জ্ঞান খুবই সীমিত। বাসন্তী নিজে বোঝে বলে সঙ্কুচিত
হয়ে থাকে। মধ্য কলকাতার বিশিষ্ট অঞ্চলে এখনো সাদা চামড়ার মেয়েপুরুষ দেখা যায়। পার্কস্ট্রিট
অঞ্চলের মিশনারি স্কুলগুলোতে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান শিক্ষকরা পাঠদান করেন। তাদের স্কুলের
পক্ষে এসমস্তই দিবাস্বপ্ন। তবু তাদের প্রভূত চেষ্টায় ছাত্ররা খানিক সভ্য হয়েছে। কারো
কারো মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ইংরাজি ও অঙ্ক দুটি বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে
দিলীপ। একদিন সে বলল, “আমাদেরও একজন অ্যাংলো টিচার পাওয়া যাইলে ভাল হইত। ছাত্ররা ইংরাজি
শিখত।”
বাসন্তী হাসল, “কী কন! এই ফ্যারৎখাইয়া ইশকুলে ম্যামসাহেব আসব পড়াতে?”
বাকি দু-জন ভয়ে-ভয়ে বলে, “ওরে মা রে! কথাই কইতে পারুম না হের লগে।”
বাসন্তী গম্ভীর, “তোমরা দুইজন শুদ্ধ বাংলা বলা প্র্যাকটিশ কর। বাচ্চাদের কী
শিখাবে?”
বাসন্তী সেদিন অনুপস্থিত ছিল। প্রথম শ্রেণীতে বাচ্চাদের সুর করে ছড়া মুখস্থ করাচ্ছিল লীলা। ছোটো একটি মেয়ে উঠে এসে তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, “দি’মুনি, দ্যাহেন দরজার চিপা দিয়া কে জানি চক্ষু দেখায়!”
“কী কস যে?”
উঠে গেল লীলা। দরজা খুলে দেখল বয়স্ক এক মহিলা, পরনে হাল্কা হলুদ ফ্রক ও গোলাপী
সোয়েটার। গায়ের সাদা ত্বক কিছুটা তামাটে ও
শিথিল, গালে মেচেতার দাগ। ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপস্টিক, সাদাটে সোনালি চুল খোঁপা করে
বাঁধা। মহিলা লীলাকে দেখে হাসিমুখে “গুড আফটারনুন” বললেন। ত্রস্ত লীলা কোনোরকমে “আপনে
খারান, আমি ডাক দেই” বলে থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। দিলীপের ক্লাসে গিয়ে বলল, “দিলীপবাবু,
ম্যামসাহেব আইছে। বাইরে খারা রাখছি। গিয়া দেখেন।”
ভয়ে উত্তেজনায় তার গলার স্বর শুকিয়ে উঠেছে।
“কী কন!”
দিলীপ বেরিয়ে এসে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল। নার্ভাসভাবে ইংরাজিতে বলল, “গুড
আফটারনুন ম্যাডাম।”
“গুড আফটারনুন। হাউ আর ইউ?”
“আই অ্যাম ভেরি গুড।”
“আপনাদের সঙ্গে কিছু আলোচনা করতে এসেছি।”
“অবশ্যই। কিন্তু আপনাকে কোথায় বসতে দেই?”
“দ্যাট ইস নট আ প্রবলেম।”
ভারী শরীরের মহিলা কষ্ট করে বারান্দার নীচু ইটের গাঁথনির ওপর বসে বললেন, “শোনো,
আমি এখান থেকে মাইলদুই দূরে থাকি। সেখানে বড় ক্লাব আছে, গলফ কোর্স আছে, তোমরা কি জানো?”
দিলীপের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ভাঙা বাংলা ও ভাঙা ইংরাজির আলাপচারিতা শেষ হলে মহিলা
বিদায় নিলেন। দিলীপও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। লীলা ও শান্তি ঘরের মধ্যে নিঃশব্দে লুকিয়ে
বসেছিল। বাচ্চারা দরজায় উঁকিঝুঁকি, নতুন রকমের অভিজ্ঞতা। মহিলা চলে যাওয়ার পর দুই শিক্ষিকা
বেরিয়ে এসে দিলীপকে ছেঁকে ধরল, “ইসে, দিলীপবাবু হেই ম্যামবুড়ি কে? আপনের চিনা নাকি?”
“না না, চিনা কেউ না। আজই প্রথম দেখলাম।”
দিলীপ আর বিশেষ ভাঙল না। সংক্ষেপে বলল, “এনার নাম বললেন লিলিয়ান জোনাথন।”
“অ। আপনে খবর করছিলেন?”
“আরে না, নিজেই আসছে। মনে হয় এই ইশকুলের খবর কেউ গিয়া দিছে। ধীরেনস্যারের সঙ্গে
কথা বলতে হবে। আজকে আবার বাসন্তীদিদিমুনিও আসে নাই!”
বাসন্তীর মেজদাদার বিয়ে ক-মাস পিছিয়েছে। পাত্রীর আপন জ্যাঠা মারা গেছেন। যদিও তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে আসেননি, তবু অশৌচ মানতে হচ্ছে। বাসন্তী আশা করেছিল দুইবৌ মিলে সংসার এবং যোগমায়ার দায়িত্ব নিলে নিশ্চিন্তে সে স্কুলের কাজে মন দিতে পারবে। দিলীপ তাকে নিজের রাজনৈতিক দলটির বিষয়ে অবহিত করার চেষ্টা করছে। রাজনীতি বাসন্তী বোঝে না, একেবারে ভালো লাগে না। রাজনীতি মানে তার কাছে ভাঙাচোরা দেশ, তারকাঁটা, অসংখ্য ঘরহারা ছন্নছাড়া ও মৃত মানুষ। সে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছে, “এইগুলা আমারে বলেন কেন স্যার? জেনে আমার কোন কাজ হবে? আমি কোনোদিন আপনেগ ভাষণ শুনতে যাব না। আপনার লালরঙ্গের মোটা বইগুলা আপনেই মন দিয়া পড়েন।”
দিলীপ সহজে রাগে না, গালভাঙা লম্বাটে শীর্ণমুখে হাসি লেগে থাকে সর্বক্ষণ। প্রায়ই
বাকিদের হাসানোর জন্য মজার কথা বলে। কলকাতার নানান খবর থাকে তার ঝোলাতে। বাসন্তীকে
বলে, “লাল বই দরকার নাই। তাহলে আমি লাইব্রেরি থেকে আপনের জন্য গল্পের বই এনে দেব।”
বাসন্তী মতামত দেয় না, বই পড়ার সময় তার নেই। বরং সময় বের করে সে ধীরেন্দ্রনাথের
কাছে যায়। তারাসুন্দরীর কাছে গিয়ে বসে, সঙ্গ দেয়। ধীরেন্দ্রনাথ বারবার ‘টিচার্স ট্রেনিং’
নেওয়ার জন্য তাকে জোর করছেন। স্কুলটি সরকারের অনুমোদন পেলে ট্রেইণ্ড টিচার রাখতে হবে।
লীলার বিষয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন, “ইশকুল পাশের সার্টিফিকেট দেখাইতে না পারলে লীলারে
ক্যামনে রাখুম হেইডাই ভাবি। তুমি, শান্তি দুইওজনাই এইবারে ট্রেনিং-এ ভর্তি লও।”
বাসন্তীর মাথায় নানারকম চিন্তা ঘোরে। সরকারি শিক্ষক-শিক্ষণ বিদ্যালয় যে ক-টি
আছে, একটিও বাসার কাছাকাছি নয়। স্কুল অনুমোদন পেলে তাকে ধীরেন্দ্রনাথ ডেপুটেশনে ট্রেনিং-এ
পাঠাতে চাইবেন। পড়ার জন্য টাকার ব্যবস্থাও দেখতে হবে। যোগমায়ার বাক্সে সামান্য ক-খানা
গহনা রাখা আছে। তার মতো অন্যদেরও তাতে ভাগ আছে। বাসন্তী ভাবে সে একমাত্র মেয়ে, তার
অংশ যত সামান্যই হোক নিশ্চয়ই মা-র কাছে আছে। বিয়ের কথা সে কখনও ভাবে নি। দেখতে দেখতে
বয়স বেড়ে গেছে। ইদানিং মনের অর্ধেক বিবাহবিমুখ হলেও বাকি অর্ধেক গোপনে কারো আসার প্রত্যাশা
করে। কবে কেউ তোইরি হয়ে এসে দুজনের পথ মিলিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করবে! সিনেমা দেখতে
সে ভালোবাসে। পাড়ার কাউকে না কাউকে সঙ্গীও পেয়ে যায়। বিভিন্ন হল্-এ উঠতি নায়ক উত্তমকুমারের
রোম্যান্টিক বই রমরমিয়ে চলে, সবই প্রায় হাউসফুল। অনেক সময়ে শেফালী মেয়েকে শাশুড়ির জিম্মায়
রেখে বাসন্তীর সঙ্গ নেয়। বেশীর ভাগ বইয়ের শেষদৃশ্যে নায়িকা উত্তমকুমারের বক্ষলগ্না।
আবিষ্ট চোখে শরীরের নায়কের বাহুতে সমস্ত ভার ছেড়ে দাঁড়ায়। উত্তমকুমারের চুলের কাট,
মোহনীয় হাসি, চোখের তারায় প্রেম বা বিষাদ মগজের কোষে ভরে নিয়ে বুঁদ হয়ে হল্ থেকে বেরোয়
দর্শক। মেয়েরা স্বপ্নে নিজের রুক্ষ, বদমেজাজি, বেরসিক স্বামী কিম্বা বিক্ষুব্ধ, হতাশ
প্রেমিকের মধ্যেও উত্তমকুমারকে খোঁজার চেষ্টা করে। বাসন্তী এইরকম মেয়েদের তুলনায় অনেক
বেশী সজাগ, বাস্তববাদী, তার পরিবারের স্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। যোগমায়ার কাছে গয়নার
কথা তোলার প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবছে। মনে হচ্ছে কাজটা আদৌ ঠিক হবে কিনা। অথচ উপায়ই বা কী!
সকালবেলা ঘরে গায়ে ভুষো একটা চাদর জড়িয়ে স্কুলের কাজ নিয়ে বসেছিল বাসন্তী। অল্প
ঠাণ্ডা পড়েছে, রোদের তেজ কম। একটু পরে বেরোতে হবে। এসময়ে রান্নাঘরে শেফালী ভীষণ ব্যস্ত
থাকে, প্রায় হিমশিম খায়। অন্যদিন সে যায়, সাহায্য করে। হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেয়। এদিন
তার শরীর তত ভালো নেই, মনও উচাটন হয়ে আছে। দিলীপবাবু ক-দিন আগে ধীরেন্দ্রনাথের কাছে
পরামর্শ চাইতে এসেছিল। একজন অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মহিলা – লিলিয়ান জোনাথন তাদের স্কুলের
সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়ে আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। সেই পত্র বাসন্তী দেখেছে, মুক্তোর মতো ইংরাজি
হস্তাক্ষর। ধীরেন্দ্রনাথ বাসন্তীকে পত্রের তর্জমা করে শুনিয়েছেন।
‘মহিলার স্বামী জীবিত নেই, তিনি ও তাঁর মেয়ে থাকেন। মেয়ে পার্কস্ট্রিটের এক
নামী ক্রিশ্চান মিশনারি স্কুলের শিক্ষিকা। লিলিয়ান নিজের বাড়িতে ঘরোয়া কেক, বিস্কিট
বেক্ করে বিক্রি করেন, চমৎকার ক্রোশের কাজ জানেন। জীবনের তৃতীয় বেলায় তিনি এদেশীয় শিশুদের
সাহচর্যে সময় কাটাতে আগ্রহী। অর্থের তাঁর প্রয়োজন নেই, বরং তিনি নিজে প্রয়োজনে অর্থসাহায্য
করতে পারলে সুখী হবেন।’
আবেদনপত্র শুনে বুকের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছিল, এমন মানুষও আছে? ধীরেন্দ্রনাথ অবশ্য
বলছিলেন, “কাউরেই ভালা ভাবনের কাম নাই। কেডা কুন ধান্দায় আসে কেও জানে না। চিপা দিয়া
ঢুইক্যা ফাল অইয়া বাইরানের গল্প ত কম দেখি নাই। আইলে আলাপ কইরা দেখুম’নে।”
ধীরেন্দ্রনাথের কথা মাথায় নাড়াতে নাড়াতে সে পেরিয়ে গেল সরু গলিপথ। আরও খানিক
এগিয়ে একটা খাটাল, ভাইঝির জন্য সেখান থেকে দুধ আনা হয়। গরুর গু-মুতের গন্ধ পেরিয়ে আরও
অলিগলি হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌঁছাল তাদের স্কুলে। পেছনের বিশাল গাছটা থেকে অজস্র শুকনো
পাতা ঝরে ঢেকে আছে সামনের সরু বারান্দাটুকু। এতটা হেঁটে এসে একটু ক্লান্ত লাগছে বাসন্তীর।
সে সিঁড়ির নীচু ধাপিতে বসল। শস্তার হাতঘড়িতে দেখল দশটা বাজতে মিনিটদশেক বাকি আছে। সাড়ে
দশটা, পৌনে এগারোটার আগে কেউ আসবে না। মোলায়েম সকালের মিঠে নরম জাফরিকাটা রোদ ছড়িয়ে
গেছে চারপাশে। পাখিরা নিজস্ব শব্দে ডাকছে। বাসন্তী বুঝি ও-দেশে ফেলে-আসা দিনের আবেশে
হারিয়ে যাচ্ছিল, পায়ের চাপে পাতার মড়মড় শুনে চোখ তুলে তাকাল। দিলীপ জিজ্ঞেস করল, “বসি?”
বাসন্তী শাড়ি, চাদর গুছিয়ে একটু সরে গেল, “বসেন।”
“যদি না রাগেন দুই-একখান কথা বলেই ফালাই?”
বাসন্তীর বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ, মুখ থেকে একটা শব্দ বের হল না। দিলীপ বলল, “ধীরেনস্যারের
সাথে আপনের কথা হইছে নাকি? উনি ম্যামসাহেবরে বিশ্বাস করতে পারতাছেন না – বলেন নাই?”
“হ্যা, বলেছেন। বললেন যে উনার লগে আগে কথা কওন লাগব।”
“আইচ্ছা। আপনের জইন্য একখান বই আনছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই। নেন, পড়বেন।”
বাসন্তী দিলীপের হাতে কাগজের প্যাকেট দেখেজানতে চাইল, “পয়সা দিয়া কিনলেন নাকি?”
দিলীপ হাসল, “না কিনলে নূতন বই এমনে কে দিব?”
বাসন্তীর মুখে দু-একটা কড়া কথা এসেছিল। কিন্তু মনোরম সকালটা নষ্ট করতে সে চাইল
না, হাত বাড়িয়ে বই নিল। ব্যাগে ঢোকানোর উদ্যোগ করতে দেখে দিলীপ বলল, “খুলে দেখেন—।”
নির্বিকার মুখে খুলল, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্পে’র সংকলন। প্রথম
পৃষ্ঠায় সুন্দর হাতের লেখায় লেখা ‘বন্ধুকে উপহার দিলাম।’
বাসন্তী হেসে বইটা ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। দিলীপ বলল, “সাহস দিলে আর একটা
কথা আছে। বলে ফেলাই? আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবেন?”
“কোনখানে? আপনের ওই পাট্টি-পুট্টিতে আমাকে ডাইকেন না।”
দিলীপের খুব মজা লাগল বাসন্তীর শব্দবিন্যাসে। সরবে হেসে বলল, “আরে না না ওইখানে
না। কিন্তু জানেন ত, আমাদের পার্টিতে আপনার মতন ডাকসাইটে কয়জন মেয়েও আছে। আপনেও ভেবে
দ্যাখবেন। সেইটা পরের কথা। এখন বলছি, মিনার্ভা থিয়েটারে অঙ্গার বলে নাটক হইব। যাবেন
দেখতে?”
“আমি ডাকসাইটে? যাকগা। মিনার্ভাটা কোথায়?”
“উত্তর কলকাতা, বিডন স্ট্রিট।”
বাসন্তী হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না প্রথমে। দিলীপ খানিক ব্যস্ত হয়ে বলল, “একা
যেতে বলি নাই, আর কাউরে সঙ্গে নিয়ে নেবেন। আপনার ভাই, ভাইবৌ – কয়জন যাবে কাল জানাবেন।
টিকিট কিনতে হবে।”
ছোটোভাই শিবনাথের কথা মনে হল বাসন্তীর, সে যেতে রাজী হতে পারে।
(ক্রমশঃ)

অপেক্ষায় ছিলাম,তীব্র অপেক্ষা এই মুহূর্তে থেকে আবার শুরু হল
উত্তরমুছুনধন্যবাদ ... অজস্র। এই অপেক্ষাটুকু উৎসাহিত করে ... লিখিয়ে নেয়।
মুছুনএগিয়ে চলুক ... ভাল লাগছে ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ । মতামত উৎসাহিত করে ।
মুছুন