![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৮ |
গন্ধজাদুকর
প্রবল গ্রীষ্মের দুপুর। অপর আলোয় আলোকিত অন্য জগতের বাল্যবেলা। তখন ফ্ল্যাটবাড়িতে হকার ঢোকা বারণ ছিল না। সাম্যদের ফ্ল্যাটটা ফ্ল্যাট হয়েও ফ্ল্যাট নয়। উপরতলার ভদ্রলোকের বাড়ি ওর বাবা বেশকিছু বছর ভাড়া থাকার পর কিনে নেওয়ায় ফ্ল্যাট আর বাড়ির সন্ধি হয়েছিল। স্কুলে তখনকার দিনে লম্বা গ্রীষ্মের ছুটি। সাম্যর বয়স দশ কি এগারো। দুপুরে বেল বাজলে আইহোল দিয়ে দেখবার মত লম্বা হলেও স্বাধীনভাবে দরজা খুলে দেবার অনুমতি ছিল না।
বেল বাজলো। আইহোল দিয়ে চেনা কাকুর মুখ। মাঝেমাঝে, বিশেষত শনি-রবিবারের দুপুরে, আগমন হত কাকুর। নাম জানতো না সাম্য। তবে উনি কী বিক্রি করতে আসেতেন, জানতো। রুম-ফেশ্নার আর সেন্ট। মার পেছনে দাঁড়িয়ে শুনেছে কাকু ডানলপে চাকরী করতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার। তাই বাড়ি বাড়ি গন্ধ বিক্রি করতে হত সারাদিন। সাম্যর মা-বাবা ওঁর থেকে রুম-ফ্রেশ্নার কিনতেন। তবে প্রতি সপ্তাহে তো আর লাগে না। তাই দু-তিন সপ্তাহ বাদে বাদে আসতেন কাকু। সাম্যর সঙ্গে কখনো একটু আধটু গল্প করতেন। মা-বাবা যখন টাকা আনতে যেত, সাম্য দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো। কাকুর ব্যাগটা বেশ ভারী মনে হত। কত সুগন্ধ তার ভিতর! গন্ধের ভার! কাকুর গা থেকে ঘামের গন্ধ পাওয়া যেত। ব্যাগের সুগন্ধ আর ঘামের গন্ধ মিলেমিশে কাকুকে সাম্যর বাল্যবেলার গন্ধজাদুকর মনে হতো।
একদিন গন্ধজাদুকর সাম্যকে একটা ছোট সেন্টের শিশি দিয়েছিলেন। পয়সা নেননি। বাবা-মাকে বলেছিলেন, ‘আপনারা সবসময় আমার থেকে জিনিস নেন, এটা নয় আমি ওকে এমনিই দিলাম।’ ‘এমনি’ শব্দ কত সহজ অথচ কত বিরল তা সাম্য সেদিন বোঝেনি। আজ তিরিশ বছর পর সাম্য যখন চল্লিশ পেরিয়ে চালশের পথে, তখন বাড়ি ফিরে হঠাৎ একদিন জরুরী কাগজ খুঁজতে গিয়ে পুরনো জিনিসের মধ্যে খুঁজে পেল সেই গন্ধশিশি। মনে পড়ে গেল গন্ধজাদুকরের কথা। কবে যে ওঁর আসা বন্ধ হয়ে গেল বাড়িতে তা কিছুতেই মনে পড়লো না। বাল্যবেলার অনেককিছুর মত এটাও আর কোনোদিন জানা যাবে না। কাকু কি অন্য কোথাও চলে গেলেন? ওঁর কি নতুন চাকরী হল? একটা খালি শিশি যার গায়ে এসব প্রশ্নের কোন উত্তর লেখা নেই।
সাম্য ঢাকা খুলে গন্ধ শোঁকবার চেষ্টা করলো। সেন্ট না হলেও ছোটবেলার একটা গন্ধ ঠিক পেল শিশির মধ্যে। হারানোর গন্ধ? না পাওয়ার গন্ধ? কষ্টের গন্ধ? জানে না সাম্য। শুধু জানে, আজ রাজ্যজুড়ে হকার উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হচ্ছে কতশত দোকান! টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে গরীব মানুষের কান্নার ছবি। সাম্য দেখছে, ওর খারাপ লাগছে, কিন্তু কিছু করে উঠতে পারছে না। গন্ধজাদুকরের শিশির ভিতর এই গন্ধটা নেই। না পারার গন্ধ নেই। কারণ গন্ধজাদুকর পেরেছিলেন। যে ভাবেই হোক পেরেছিলেন। তাই তো তিনি জাদুকর। পারেনি সাম্য। সাম্যরা কিছুই পারেনি। যত দামীই হোক না কেন সাম্যর পারফিউম, তার সারা শরীর জুড়ে লেগে আছে শুধু না পারার গন্ধ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন