সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান


 

(১৩)    

‘আমি যেন সেই বাতিওয়ালা’

বিয়েতে সুতীর শাড়ি পেয়েছে অমলা, কাঁসার থালা-বাটি ক-খানা, অনেকগুলো বই। একটাকা দেড়টাকা দিয়েও মুখ দেখেছেন অনেক গুরুজন। দিবাকরের শৌখিন বন্ধু সুভাষ নতুন আগ্ফা বক্স-ক্যামেরায় ফোটো তুলেছে বিয়ের অনুষ্ঠানের। খাওয়াদাওয়ার পর একটু রাতে দল বেঁধে অনেকে ঘরে ফিরল, ঘনিষ্ঠ যারা তারা রইল। ধীরেন্দ্রনাথকে নিয়ে মধুসূদনও ফিরে গেল। সম্প্রদান, হোম ইত্যাদি ধকলের পর তাঁর বিশ্রামের দরকার। সকালে আবার আসবেন। তারাসুন্দরী রইলেন মহিলাদের সঙ্গে, তাঁরও শরীর-মন কোনওটাই ভালো না। রমলার আসতে না-পারা বড় বিঁধেছে। বাসন্তী কাছটিতে বসেছিল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তারাসুন্দরী বললেন,

“তুই যা মা, অহন অমুর লগে থাক।”

বাসন্তীর মা যোগমায়া শেফালী আর বিশ্বনাথের সঙ্গে বাসায় ফিরেছেন। শেফালীর যদিও একেবারে ইচ্ছা ছিল না, ভেবেছিল পাড়ার মেয়ে-বউ মিলে বাসর জাগবে, হৈচৈ করবে। ঘরে আলো নেই, পাখা নেই, কাদা-কাদা উঠোন, মশার আড্ডা। ঘ্যানঘ্যানে বিহ্বল শাশুড়ি, কোলে অবুঝ কচি মেয়ে, তার বর আর শম্ভুনাথ। শম্ভুনাথকে আর ভয় পায় না সে, বরং একরকমের মায়া তৈরি হয়েছে। আলগা স্নেহ, হয়ত আসলে ভালোবাসা।

বেশী রাতে মুষলধার বৃষ্টি নামল, ভেজা হাওয়াতে জলকণা উড়ছে। সারাদিনের চাপধরা গরম, দরদর ঘামের পর এমন বৃষ্টি আরামের। বাসরঘরে মেঝেতে তোষক পাতা হয়েছে, নীলরঙের ডোরাকাটা চাদরে মোড়া। দিবাকরের পাশে বসে খালি গলায় নজরুলগীতি গাইল বন্ধু সুখময়। বাসন্তীর গা-ঘেঁষে শাড়ি-গয়নায় প্রায় পুঁটুলির মতো বসা অমলা ফিশফিশ করল,

“তুমি একখান গাও না বাসন্দিদি!”

মন্দ গায় না বাসন্তী, কিন্তু এত মানুষের মধ্যে গান গাওয়াতে ভারী অস্বস্তি। তবু অমলার অনুরোধে লজ্জা কাটিয়ে গাইল আধুনিক গান “এমনই বরষা ছিল সেদিন—।” পাড়ারই আর একটি বউ গাইল রবিঠাকুরের বর্ষার গান। দিবাকরকে গাইবার জন্য উপরোধ করেছিল সকলে। গাইতে সে পারেনা। অনেক জোরাজুরির পর আবৃত্তি করল ‘প্রিয়তমাসু’। শুরুতে নীচু স্বর ছিল। ক্রমশঃ সেসব কাটিয়ে সজীব কণ্ঠ ভরে উঠল আবেগে, 

“তোমাকে ভেবেছি কতদিন

কত শত্রুর পদক্ষেপ শোনার প্রতীক্ষার অবসরে

কত গোলা ফাটার মুহূর্তে।

কতবার অবাধ্য হয়েছে মন, যুদ্ধজয়ের ফাঁকে ফাঁকে।

কতবার হৃদয় জ্বলেছে অনুশোচনার অঙ্গারে,

তোমার আর তোমাদের ভাবনায়—।”

অমলার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। আবৃত্তি শেষ হলে উপস্থিত সকলে স্তব্ধ। কবিতার বোঝা, না-বোঝা শব্দগুলো ছুঁয়ে গেছে প্রত্যেককে। রোগা-পাতলা শান্ত গম্ভীর অমুর বর এমন কবিতা বলে? আড়চোখে অতি সাবধানে যেন কেউ টের না পায় তেমনভাবে দিবাকরের হাতদুটি দেখল অমলা। ফর্সা, শিরা-ওঠা, সরু আঙুলগুলো আস্তে আস্তে নড়ছে। একটি আঙুলে বিয়ের নতুন সোনার আঙ্টি। প্রবল ইচ্ছে সত্বেও সঙ্কোচে নিজের হাতটা সে ছোঁয়াতে পারল না। মন্দের ভালো, আকাশ কালো হলেও পরদিন সকালে বৃষ্টির তেজ কম। স্ত্রী-আচার ও অন্যান্য বাসি বিয়ের অনুষ্ঠান মিটল। শয্যাতোলনির টাকা নিয়ে হাসিঠাট্টা, দর কষাকষির পর পাওয়া টাকা জমা রাখা হল নিরঞ্জনের কাছে। ঠিক হল দ্বিরাগমনে জোড়ে এলে দল বেঁধে ট্রামে করে ভবানীপুরের হলে উত্তমকুমারের বই দেখতে যাওয়া হবে। মোগলাই পরোটা খাওয়া হবে রেস্টুরেন্টে।

বড় উনুনে গতরাতের বাসি রান্না জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে একটু টকে গেছে সবই প্রায়, টকগন্ধ বাতাসে ছড়াচ্ছে। ঝুড়িতে রাখা বেঁচে-থাকা ভাত জল কাটছে। মাংসের ঝোলের তলানিটুকু পড়ে আছে, মাছের কালিয়ার গামলায় ভাঙা টুকরো। বাজার ভয়ানক অগ্নিমূল্য, হাত ছোঁয়ালেই ছ্যাঁকা লাগে। কিছু ফেলে দেওয়ার চিন্তা করাও মহাপাপ। সব ঘরেই খাওয়ার মুখ অনেক। পুরুষদের পাতে সর্বদা না দিলেও বাসি-টোকো তরকারি জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে খেয়ে নেয় মেয়েরা। বাসী ডাল শুকিয়ে বা লেবু-পেঁয়াজ-লঙ্কার টাকনা দিয়ে পান্তাভাত, কখনও হয়ত একটু তেলে নেড়ে-চেড়ে ঘেমো ভাত দিয়ে ভাতভাজা। ওসব নিজেদের সংসারে চলে। নতুন জামাই আর বন্ধুদের জন্য টাটকা মাছ কেনা হয়েছে। আলু দিয়ে ঝোল হবে, গরম ভাত ফুটছে। একটু বেলায় বেরিয়ে মুরারী ভিজতে ভিজতে বড় হাঁড়ি-ভরা ল্যাংচা নিয়ে এল। সন্ধের পর বিদায় নেবে অমলা, পরিবারের তাই নিয়ম।

কালীকিঙ্কর-কনকপ্রভার ভাড়ার বাসায় মেলা লোকজন। ছেলের বিয়ে তাঁদের শেষ দায়িত্ব। শোওয়া-বসার তত অসুবিধে নেই অবশ্য, অন্য ভাড়াটেদের ঘরে অবারিত দ্বার। গরমকাল বলে লেপকাঁথা বা বাড়তি বিছানার দরকার হচ্ছে না। পুরুষদের জন্য খাট-বিছানা ছেড়ে দিয়ে মেয়েরা মেঝেতে মাদুর, সতরঞ্চিতে। মাথার নীচে কিছু পেলে ভালো, না পেলে নিজের হাত, শাড়ির আঁচল, চুলের খোঁপাতে কাজ চলে যায়। ছেলেরা ছাদে শুতে পারে, কিন্তু দমকে দমকে আসা বৃষ্টি সে ব্যবস্থায় বাধা দিয়েছে। পাঁচবছর পর বড়ো মেয়ে সুমতি ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাক্স-পোঁটলা নিয়ে আগরতলা থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছাল সন্ধের দিকে। সঙ্গে জামাই পরিমল, দু-বছরের ছোটো-বড়ো কিশোর বলাই আর নিতাই। ছেলেদুটি লম্বায় টান দিয়েছে, ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁপের আভাস। স্বভাবত সংযত কনকপ্রভা ওদের দেখে আবেগ সামলাতে পারছেন না। শেষবার যখন দেখা হয়েছিল, ছোটো ছিল দুই নাতি। সুমতি যে শেষ পর্যন্ত আসতে পারবে ভরসা ছিল না। কালীকিঙ্করের এক বোন চমৎকার বউছত্র এঁকেছেন চাতাল জুড়ে। সকলে প্রার্থনা করছে বৃষ্টি না আসার। সুমতি সুলেখা দুই বোন গলা জড়াজড়ি করে চোখের জল ফেলার পর বধূবরণের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুলেখার স্বামী শৈলেন গেছে বউ আনতে।  

বধূবরণ, দুধের মধ্যে সংসারের সুখ উথলানো, কড়িখেলা, আঙ্টিখেলা পরপর। দিবাকরের ক্লান্ত লাগলেও বলার উপায় নেই। অমলার দায়িত্ব নিল মহিলামহল। মুখ বন্ধ রেখে নিজের অংশের কাজটুকু সম্পন্ন করল দিবাকর। খাওয়া-দাওয়া সেরে ছাদে গেল নিরিবিলিতে। ছাদের একধারে প্যাণ্ডেলের বাঁশ বাঁধা, উনান, কয়লা, কাঠ গুছিয়ে রাখা। বউভাতের প্রীতিভোজের ব্যবস্থা করা আছে। আকাশে দু-একটা বিদ্যুতের ঝলক দেখা গেলেও কালো মেঘের স্তূপ হালকা ঢেউয়ের মতো সরে সরে যাচ্ছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদের মুখ দেখানোতে আলো-আঁধারির সৌন্দর্য বেড়েছে। সে ছাদের আলশেতে একলাটি বসে একটা চারমিনার ধরাল। একটু চিন্তা হচ্ছিল অমলার জন্য। আসার সময় প্রবল কান্নাকাটির ঝড়ে সম্ভবত অমলা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, কাঁদেনি, কথাও বলেনি। দম-দেওয়া পুতুলের মতো ট্যাক্সিতে গিয়ে বসেছিল। দূরত্ব যদিও ছ-সাত মাইলের বেশী নয়, কিছুদূর যাওয়ার পরই অমলা মুখচোখ লাল করে মুখে হাত চাপা দিয়ে কোনওক্রমে বলেছিল, ‘বমি আসছে।’ দিবাকর দ্রুত রাস্তার একপাশে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিয়েছিল। প্রচণ্ড তোড়ে বমি করে নির্জীব হয়ে পড়েছিল অমলা। বাকি পথটা চোখ বুজে নেতিয়ে বসেছিল। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে আপনমনে একটু হাসল দিবাকর,

“বাবার বাড়ির ভাতের শেষ দানাও উগড়ে দিলে অমলা?”

সিগারেট শেষ করে নীচে নামার জন্য পা বাড়িয়ে দেখল দুই জামাই ছাদে উঠে এসেছে, হয়ত তার খোঁজেই। দিদির বিয়ে হয়েছে অনেকবছর আগে, পরিমলবাবুর সঙ্গে তার পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়নি। রসিক লোকটি দিবাকরের থেকে বয়সে বেশ বড়ো। ছোটো জামাই শৈলেনকে দিবাকর মোটেই পছন্দ করে না। বেশ কম বয়সে সুলেখার বিয়ে দেন কালীকিঙ্কর। পারিবারিক সচ্ছলতা, কৌলীন্য আর সুদর্শন চেহারা দেখে পাত্র নির্বাচন করেছিলেন। তখনও দেশ কাটা পড়েনি যদিও কিন্তু রাজনীতিক স্থিতি অত্যন্ত বেসামাল। শৈলেনের পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদারের নায়েব, অর্থবান পরিবার। শৈলেনের বাবার আমলে বাইরের ঠাটবাট বজায় থাকলেও তালপুকুরে ঘটি না ডোবার দশা। দেশভাগের বছরদুই পরে তাঁরা সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন। শৈলেন বড়ো ছেলে, স্বভাবে অলস ও অকর্মন্য। কাজে-অকাজে দেখা হলে অভাবের কথা বলে এবং টাকা ধার চায়। ছোটোবোনের সম্মান রাখতে শৈলেনকে কড়া কথা বলা থেকে বিরত থাকে দিবাকর। বারকয়েক তার জন্য ভালো কাজের ব্যবস্থা করে দিতে বলেছে। প্রথম প্রথম কাজের সন্ধান দিয়েছে সে। শৈলেন যথারীতি যায়নি, মুখ বাঁকিয়ে বলেছে,

“না দাদা আমারে দিয়া ওই কাজ হবে না। হের চাইতে ট্রামের কন্ডাক্টরি করা ভালা।”

পরিমলবাবু এগিয়ে এসে হেসে ঠাট্টা করল,

“অ শালাবাবু, নববধূরে মনে ধরছে নি? আইজকাল কই জানি যায় হনিমুন না মধুচন্দ্রিমা—যাইবা নাকি?”

দিবাকর হেসে প্রশ্ন এড়িয়ে গেল। প্রসঙ্গ বদলে বলল,

“আপনেরা কলকাতা কেমনে আসলেন জামাইবাবু? আগরতলা থেকে কলকাতার সরাসরি কোনও কানেকশন ত নাই।”

পরিমলের পরিবার পুববাংলা ছেড়ে আগরতলায় গিয়ে থিতু হয়েছেন দেশভাগের অল্প আগে। কলকাতার মতো সেখানে জনবহুলতার চাপে পড়তে হয়নি। দেশের জমি-ঘরবাড়ি বিক্রি করে আর্থিক লাভ হয়েছিল। ওখানে হাইস্কুলে চাকরি করছে পরিমল। পরিমলের দাদাদের একজন সরকারি দপ্তরে কাজ করে, অপরজন টী-এস্টেটে সুপারভাইজার। সচ্ছল অবস্থা সম্পন্ন পরিবার। দিবাকরের প্রশ্নের উত্তরে পরিমল কাঁচুমাচু মুখ করল,

“হ, ঠিকই। কলকাতায় আসন কি মুহের কথা? আইতে অইল, গিন্নির মর্জি বাদশার মর্জি। বিয়া করছ, অহন বোঝবা। তমার দিদি কাইন্দা-কাইট্যা অধীর, ‘আমার একমাত্তর ভাইডার বিয়া, যামু না? কতবচ্ছর মা-বাপের মুখও দেহি নাই।’ তয় কী করনের আছিল? আগরতলা এরোড্রোমে প্লেনে গিয়া বইলাম, গৌহাটিতে নামাইয়া দিল। গৌহাটিতে আমার খুড়াত বইনের শ্বশুরবাড়ি। তাগ ঘরে একডাদিন থাইক্যা বইনের জামাই পৌছাইয়া দিল স্টেশনে, ট্র্যান ধরলাম। এক্কেরে যারে কয় বিধ্বস্ত অবস্থা!”

বড় বড় চোখে শুনছিল শৈলেন। স্বরে সমীহ এনে বলল,

“প্লেনে এক্কেরে আকাশ দিয়া উইরা আইলেন? কী সৌভাগ্য! আপনেরা হলেন গিয়া ধনী মানুষ—।”

“আরে কী কও! ধনী-দরিদ্র ওইসব কিছু না। উপায় না থাকলে আইবা কমনে? পাচ-ছয় বচ্ছর পূর্বে চাটগাও দিয়া ট্র্যানে আইছিলাম। অবস্থা আইজকার মত এমন খারাপ আছিল না। কী অইতাছে ওই দ্যাশে, খবর-বার্তা পাও না?”

দিবাকর চুপ করে শুনে মাথা নাড়ল, ওপারের খবরের অনেক কিছু সে জানে। পাঁচবছর আগের অবস্থা চেয়ে অবস্থা এখন আরও কঠিন। একনায়কতন্ত্রী সরকার পূর্ববাংলাকে ক্রমাগত কোনঠাসা করে তুলছে। মানুষ সন্ত্রস্থ, ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমা হচ্ছে। এভাবে দেশ ভেঙে কার কী লাভ হল? প্রতিদিন দলে দলে মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসছে ভারতে, এরাজ্যে। কলকাতার পথঘাটে মানুষের ভীড় উপচে পড়ছে। সরকার খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়েছে যার সঙ্গে সাধারণ মানুষ তাল রাখতে পারছে না। দৈনন্দিন যুদ্ধে, বেঁচে থাকার তাগিদে অদ্ভুত লড়াই চলছে। সরকারের মতিগতি ধোঁয়াটে ঠেকে, হয়ত সরকারও কুলকিনারা পাচ্ছেনা! শোনা যাচ্ছে রাজ্যের ওপর চাপ কমাতে বাস্তুহারাদের নতুন প্রকল্পের আমদানি করা হচ্ছে। দিবাকর মাথায় চাপ অনুভব করল, সংগ্রামের দিনগুলো মনে পড়ল। সে দলগতপ্রাণ একজন মুখ্য কর্মী ছিল। নিজের ওপরে তীব্র রাগ উঠে এল ভেতর থেকে। ইচ্ছে হল চাকরি ছেড়ে, নতুন বউ ছেড়ে, আগের মতো নিজের কাজে, দশের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে থিতু করার জন্য মা-বাবা অমলাকে বেঁধে দিয়েছেন তার সঙ্গে। গভীর আপশোশ হল। প্রতিবাদ করতে পারত তখনই, অন্তত আপত্তি জানাতে পারত। আর উপায় নেই। ফেরার পথটায় ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অমলার সিঁদুর-লেপা মসৃণ কপাল আর মাথা তার কাঁধে ন্যস্ত ছিল। নরম চুলের সুঘ্রাণটুকু মুহূর্তের জন্য ভেসে এল। উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে সে স্বগতোক্তি করল, “ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস।”

ধীরে-ধীরে অমলা মন বসানোর চেষ্টা করছে নতুন পরিবারে। তার ননাস সুমতি প্রায় মাসদেড়েক এবাড়িতে থেকে সবে ফিরে গেছে। তারা চলে যাওয়াতে বাড়ি ফাঁকা। আবার ক-বছর পর আসতে পারবে ঠিক নেই। অমলারও খারাপ লাগছে। স্নেহপ্রবণ সুমতি আদর করে কাছে টেনে নিয়েছিল তাকে। বয়সে তার চেয়ে প্রায় পনেরো বছরের বড়ো। সেই থেকে কনকপ্রভার মন ভালো নেই। গম্ভীর মানুষ আরও গম্ভীর হয়ে গেছেন। কালীকিঙ্কর তাকে স্নেহ করেছেন অমলা বুঝেছে। তাকে কাছে ডেকে বলেন,

“শুন বউমা, তুমার বাবায়ও কন তুমি বি-এ কমপ্লিট কর। আমার হাতদুইটা ধইরা কইছেন। এতদূর আউগাইয়া থাইমা যাওন ঠিক না। আমি ইংরাজির মাস্টার রাইখ্যা দিমু’নে। পাশ কইরা টিচার্স ট্রেনিং লইবা। তুমি এই যুগের মাইয়া বুঝই ত আমগ পায়ের নীচে মাটি নাই। লইড়া মাটির বেবস্থা করন লাগব।”

কালীকিঙ্করের কথায় অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন কনকপ্রভা। তাঁকে খুব ভয় পায় অমলা। ইনি তার মা তারাসুন্দরীর মতো নরম, সরল স্বভাবের নন। সেই প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে সে গুটিয়ে যায়। একদিন তার সামনেই কনকপ্রভা কালীকিঙ্করকে বলেছেন,

“তাইরে তুইল্যা ছিকায় থুইবেন নি? ঘরের বউ কলেজের পড়া পড়ব, মাস্টর আইব, অপিস করব। আমি ত কামের বেডি, রাইন্দা-বাইরা খাওইয়ামু। ক্যান আমগ পোলার ট্যাহায় কুলাইব না? জমিদারের মাইয়ারে আনছেন?”

অমলার বুকের মধ্যে প্রচণ্ড ধড়াস-ধড়াস করে শব্দ হচ্ছিল সেদিন। মনে মনে বলছিল ‘ধরণী দ্বিধা হও।’ শ্বশুরমশাই যতই আশ্বাস দিন, কনকপ্রভা স্নেহশীলা, খাঁটি মানুষ, শোকে-তাপে এমন রুক্ষ হয়েছেন – অমলা কিছুতেই সহজ হতে পারছে না। কালীকিঙ্কর নিজেও হয়ত অনেক সময় কনকপ্রভার এমন পরিবর্তনে বিস্মিত হন। অমলা কিন্তু শাশুড়ির নামে দিবাকরকে একটি অভিযোগও করেনা, ভাবতেই পারে না। আসলে দিবাকরকেও সে এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। শান্ত, গম্ভীর, প্রচুর লেখাপড়া-করা মানুষ খানিকটা তার মা-র মতো, দুর্বোধ্যও বটে। এবাড়িতে অমলার এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো লেগেছে সুইচ টিপে আলো জ্বালানো, হাতপাখার বদলে সুইচ টিপলেই বনবন করে ঘোরা ছাতপাখা। কলের অঢেল জলে স্নান, কাপড়কাচা। শাশুড়ি যতই রাগী হোন, তাঁকে সাহায্য করা, ফাইফরমাশ খাটা ছাড়া কাজকর্ম বিশেষ করতে দেন না।

দুপুরবেলা খাবার পর একলা ঘরে শানবাঁধানো লাল মেঝেতে বিয়ের পাটি পেতে গল্পের বই নিয়ে অমলা শোয়। অনেক গল্প-কবিতার বই সে উপহারে পেয়েছে। ঘুমের মধ্যে কোনও কোনওদিন বাপের বাড়ির বাগানের বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ আসে। টালির চালে টাপুরটুপুর বৃষ্টির শব্দ পায়।

(ক্রমশঃ)

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন