সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

 

কবিতার কালিমাটি ১৫৬


পাকুড় ও কিশোরীরা

জঙ্গলের পাশে আমি মন্থরগামী হয়ে উঠলাম। দুই কিশোরী তাদের পায়ের নিচে শব্দের খোলা বাজার গড়ে তুলছে। তাদের পদমুদ্রায় অস্থির শুকনো পাকুড়পাতা মধ্যাহ্নের ত্বকে সিল্ক ঘষছে। তাদের হাসির সাথে সরে যাচ্ছে নিস্তব্ধতার পর্দা।

হাসির উজ্জ্বলতা ঘাস থেকে আচমকা উড়ে যাওয়া পাখির দলে রূপান্তরিত হয়। স্নিকারের একটানা চাপে মাটি থেকে বেরিয়ে আসে আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চারণের ভেতর বন্দি অযুত নিশ্বাস।

পাকুড় গাছটি কয়েক দিন আগেই কেটে ফেলা হয়েছে। হারানো স্বপ্নের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে তার গোড়া।

গোড়ার শীর্ষভাগ এবড়োখেবড়ো, স্পষ্ট হয়ে আছে দৈত্য-কামড়ের দাগ—কুঠারের সহিংসতা প্রতিপাদনের জন্য তদন্ত নিষ্প্রয়োজন।

কুঠারের রয়েছে হিংস্রতার খ্যাতি।গোড়াটির প্রতিটি ক্ষতচিহ্নে জমে আছে এক একটি চিৎকার—যন্ত্রণার অব্যক্ত ধ্বনি।

ক্ষতের নিচে কেঁপে ওঠে সামান্য আলোক । কুঠারের দাগের কাছে বেরিয়ে আসছে কোমল অঙ্কুর—কর্তিত পাকুড়ের মেহগনিরং শিখা।

প্রকৃতি পুনরুত্থানের মহড়া চালিয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপ ফুঁড়ে জন্ম নেয় অনমনীয় চেতনা।

কিশোরীরা এ হনন ও প্রত্যাবর্তনের ইতিবৃত্ত কিছুই জানে না। তারা কেবল শুকনো পাতার শব্দের ভেতর সঙ্গীতের ঐশ্বর্য খোঁজে।

তারা জঙ্গলের ভেতরে আরও একটু এগিয়ে যায়। শুকনো পাতা ভঙ্গুর স্বরে তাদের স্বাগত জানায়।

প্রতিটি দলিত পাতায় প্রতিধ্বনিত হয় বিদায়মুহূর্ত। জঙ্গল শীতের শুষ্কতা মনে রাখে।

কিশোরীরা শব্দের আনন্দে বিভোর। তাদের হাসি ঝোপের ভেতরে এগিয়ে জলাশয়ে সাঁতার কাটে।

দলিত পাতাগুলো একদিন সবুজ রঙের দীপ্তি ছড়িয়েছে, উদ্ভিদের খাদ্য প্রস্তুত ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেছে। এখন তারা মৃতদের সমগোত্রীয়, কোমল পদপ্রান্তের ক্রীড়নক।

যৌবন কি কখনো নিস্তব্ধতার স্মৃতিস্তম্ভের সামনে থমকে দাঁড়ায়? উচ্ছল স্রোতঃস্বতীর কাছে সে ছুটে চলে যায়।

কিশোরীরা একবারও বিমর্ষ গোড়াটির দিকে তাকায় না। অঙ্কুরের ঔজ্জ্বল্য তাদের আকর্ষণ করে না।

গোড়াটির দিকে জঙ্গলের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। জীবনান্তক ক্ষতের নিচে ধীরে জাগ্রত হচ্ছে একটি নির্বিশঙ্ক সত্তা : প্রত্যাবর্তনের নিভৃত প্রভা।

 

বৃষ্টি

বৃষ্টি-অভিধান থেকে শব্দ ঝরে। মেঘের হুংকারে বৃষ্টির শব্দ ম্লান হয় না। প্রত্যেকটি শব্দ প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিকে স্পর্শ করে।

বৃষ্টির শব্দের উচ্চারণ অপরিবর্তনীয়। আকাশের কোথাও উচ্চারণের বিশুদ্ধতা নিয়ে অহর্নিশি নিরীক্ষা চলে।

বৃষ্টির শীতল বাতাস বক্ষ ছুঁয়ে যায়, দীর্ঘদিন জমে থাকা উত্তাপ অপসৃত হতে থাকে। দেহের ঋতুচক্রের ঘণ্টি শ্রুতিগম্য হয়ে ওঠে।

কামারশালার আগুনের স্মৃতি ক্ষীণতর হয়ে আসে, ভস্ত্রার হাওয়ায় ওড়ে সংখ্যেয় স্ফুলিঙ্গ।

মেঘ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসে অগ্নিশিখা—ঝাঁঝালো আলোর শরজাল মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হবার সাথে সাথেই অদৃশ্য হয়ে যায়।

রেটিনার ধারণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাতাসে থেকে যায় কম্পন, ত্রাসের নিশ্চিত উপস্থিতি।

পার্কের বেঞ্চের নিচে জল জমে। স্পন্দিত জলের ওপর জেগে ওঠে অবচেতনের খণ্ডিত দৃশ্যাবলি।

অনেক দিন আগে বেঞ্চে লেগেছিল অশ্রুর দাগ, কাঠের ভেতরে নিঃশব্দ মনোগ্রাম।

আজ বৃষ্টির সাথে ভেসে আসে বিশল্যকরণী উপাখ্যান। সমস্ত দাগ থেকে বাষ্পীভূত হতে থাকে বিষণ্ণ ক্লেদ।

বৈদ্যুতিক বাল্বের চারপাশে বৃষ্টি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে—উল্লম্ব রেখায় ঝরে পড়ে মৃদূৎপল-স্বপ্ন।

বাতাস রেখাগুলোকে বাঁকিয়ে দেয়। জলবিন্দু বাঁকা পথে ভেসে আসে—তাদের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সবুজ পত্রালির আহ্বান।

বৃষ্টি বৃক্ষের প্রার্থনায় বিগলিত হয়। মানুষ বৃষ্টির ঔদার্য স্বীকরণে পরাঙ্মুখ; মানুষ আর্দ্র হতে জানে না বলে বৃক্ষের প্রার্থনা উপেক্ষা করে।

বাতাস বৃষ্টির আশ্রয়, মানুষেরও। বৃষ্টি নির্দ্বিধায় বাতাসের অনুবর্তী হয়; মানুষ বাতাসের জন্য প্রধানত উন্মোচন করে বিষাক্ত আকাশপথ।

বজ্র প্রচণ্ড শব্দ ও শক্তির আধার। বজ্র বাসগৃহে কম্পন জাগায়, অস্তিত্বের ভেতর সঞ্চারিত করে অস্থিরতা।

বজ্র আকাশে সৃষ্টি করে ভয়ঙ্কর মুহূর্ত; ক্ষণকালের জন্য পৃথিবীর ক্রনোমিটার থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে এর বৈদ্যুতিক শক্তি নিশ্চিত করে শস্যের অনুপুষ্টি। মানুষের জিঘাংসা উত্থানচেতনাকে নির্মূল করে।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন