সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

শুক্তি ঘোষ

 

ভাষা, লিপি, বর্ণ, হরফ...  ইত্যাদি




ছোটখাটো এক সাহিত্যবাসর। বইপাড়ার এক তরুণ তুর্কি বক্তব্য রাখছেন। সপ্রতিভ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি। আমিও চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব মন দিয়ে শোনার, যদিও খুব যে মনস্ক ছিলাম, তেমন দাবী করব না হঠাৎ ---

 কাজেই শুধু বাংলা ভাষাই নয়, অলচিকি ভাষাও …”

ধড়মড়িয়ে সোজা হয়ে বসতে হল অলচিকি ভাষা? এমন কোন ভাষা আছে বলে তো শুনিনি কখনো যতদূর জানি পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু বিশেষ করে সাঁওতালি ভাষা লেখার জন্য অলচিকি লিপির প্রবর্তন করেছিলেন কিন্তু সে তো লিপি, ভাষা নয় বললাম বটে সেটা মিনমিন করে, তবে সেটা কেউ কানে তুলল বলে মনে হল না

ভাষা আর লিপি এক নয়। এমনকি তাদের সম্পর্ক অন্যোন্যকও নয়। বিস্তর ভাষা, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ অনাত্মীয় ভাষাও একই লিপিতে লেখা হয়যেমন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর পশ্চিমতম প্রান্তের (পুরনো পৃথিবীর হিসাবে) সদস্য ইংরেজি আর ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে নাগাল্যাণ্ডের ভোট-চীনা (সিনো-টিবেটান) ভাষাগোষ্ঠীর নাগামীজ --- দুইই লেখা হয় রোমান, তথা লাতিন বর্ণমালায় আবার একই ভাষা সময়ের সাথে সাথে নানা কারণে (রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অথবা অন্য কিছু) বদলে ফেলেছে তার লিপি, একেবারে খোল নলচে শুদ্ধু যেমন তুর্কি ভাষা। ছিল ফার্সি-আরবি (perso-arabic), কামাল আতাতুর্কের সময় থেকে হয়ে গেল রোমান কিংবা ঘরের পাশে মেইতেই মণিপুরি --- কিছুদিন আগে পর্যন্ত লেখা হত বাংলা লিপিতে, কিন্তু এখন বদলে যাচ্ছে মেইতেই মায়েকে এমন আরো বহু উদাহরণ ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্ব জুড়েই

ভাষা (language), লিপি (script), হরফ (font), বর্ণ এবং বর্ণমালা (alphabets and alphabetical systems) --- এরা পরস্পর সংশ্লিষ্ট, কিন্তু সমার্থক নয় সব ভাষার লিপি নেই, সব লিপির বর্ণমালা নেই, আবার একই বর্ণমালার দৃশ্যরূপ (হরফ, বা script), স্থান, কাল এবং পাত্র বা পরিস্থিতি ভেদে এত প্রচুর বদলে যেতে পারে যে তখন তাদের এক ঝলকে এক বলে চেনা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায় যেমন আমাদের ভারতীয় বাইন্ডিক’ (ভারতী) বর্ণমালা আমরা সকলেই জানি প্রধান প্রধান ভারতীয় ভাষাগুলি দুই ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত যেমন ভারত উপমহাদেশের উত্তর অংশের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহ, যা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত, আর দক্ষিণ ভারতের চার প্রধান ভাষা, যা দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত লিপির বেলায় কিন্তু সব ভারতীয় লিপির উৎস একই, আর তা হল ব্রাহ্মী লিপি গত দুহাজার বছর ধরে আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপী ভারতবর্ষ একটি অভিন্ন (বা প্রায় অভিন্ন) বর্ণমালা ব্যবহার করে চলেছে, যা পৃথিবীর প্রধান প্রধান বর্ণমালাতন্ত্রের একটি ভারতবর্ষের বাইরে উত্তরে নেপাল, তিব্বত, দক্ষিণে সিংহল আর পূর্বে মায়নামার (পূর্ববর্তী বর্মা) থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহদংশ জুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে ভারতী লিপি, বা তার কোন না কোন পরিমার্জিত রূপ প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় বর্ণমালা বিশ্বের সবচেয়ে সুবিন্যস্ত, বিজ্ঞাননির্ভর বর্ণমালারীতিমত গাণিতিক সূত্র মেনে তৈরি এই বর্ণমালা প্রাচীন ভারতের প্রজ্ঞার আর এক অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন

অথচ রূপকথার গল্পের সুয়োরানি-দুয়োরানির মত বড়রানি, সুওরানি, ‘ভাষা’ (পড়ুন, সংস্কৃত ভাষা)-র কপালেই যত আদর, যত গুণগান। ওদিকে ছোটরানি, দুওরানি, ‘লিপি’-র কপালে শুধুই নিন্দেমন্দ আর দুচ্ছাই! মাঝে মাঝে কেউ কেউ তো তাকে রীতিমত কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করার কথাও বলে থাকেন। এই আদর-অনাদরের উপাখ্যানও বোধ করি রয়ে গেছে রূপকথার গল্পেই।  প্রাজ্ঞ, ভারতবিদ্‌ ম্যাক্সমুলারের পথ ধরে পশ্চিম দেশের রাজপুত্তুরেরা ভাষাকেই মাথায় তুলেছেন, ফিরেও তাকান নি লিপির দিকে। তার একটা কারণ যদি হয় গ্রীক, লাতিনের মত ভাষার সাথে সংস্কৃতের আত্মীয়তা তো অন্য কারণটি হল ঔপনিবেশিকতার রাজনীতি (দ্র. বুদ্ধদেব বসু অনুদিত ‘মেঘদূত’, ভূমিকা)সে কারণ যাই হোক, শাস্ত্রবাক্য অনুসরণ করে আমরাও তাই মহাজনের পন্থানুসারী। শিবরাম চক্রবর্তী মশাই তো বলেইছিলেন, ‘বাঙালি স্বভাবতই পশ্চিমমুখো’

এবারে আসা যাক আর একটি খুব পরিচিত লিপি ও বর্ণমালার প্রসঙ্গে যাকে আমরা, শিক্ষিত ভারতীয়েরা, চলতি কথায়ইংরেজি লেখাবলে জানতে এবং মানতে অভ্যস্ত  আদতে এটি রোমান, বা লাতিন লিপি ধরে নেওয়া যায় প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের হাত ধরে এই লিপি ও বর্ণমালা এক সময়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল তবে তখন মোটের ওপর একই বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও স্থান, কাল, পাত্র ইত্যাদির নিরিখে তার দৃশ্যরূপে পার্থক্য ছিল প্রচুর অনেকটা যেন আমাদের এখনকার বিভিন্ন প্রচলিত ভারতীয় লিপির মত রেনেঁসার সময়ে ছাপাখনার হাত ধরে এল মুদ্রণ-বিপ্লব ফলে কিছুটা স্বাভাবিক ভাবে, আবার অনেকটাই হয়তো সচেতন প্রয়াসে, বদলে যেতে লাগল লেখালেখির দুনিয়া আর এইভাবেই বিবর্তনের পথ বেয়ে তৈরি হল আজকের সর্বজনগ্রাহ্য আধুনিক রোমান লিপি যদিও একই লিপি ও বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও এর হরফের বৈচিত্র্য রীতিমত তাক লাগায় তাছাড়া প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয় ভাষাই নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে প্রচলিত লাতিন লিপির কিছু কিছু রদবদল করে নিয়েছেতাদের সাথে ইংরেজিভাষীরাও এই লিপি ও বর্ণমালার ব্যবহারকারী, তার উদ্ভাবক বা স্বত্বাধিকারী নয়  তবু, অভ্যাসবশত, এই বিভ্রমই আমাদের কাছে সত্য

লাতিন লিপির উদ্ভব গ্রীক লিপি থেকে ভাষার দিক থেকে না হলেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতে নানা ভাবে গ্রীক লিপির ব্যবহার আন্তর্জাতিক ভাবে সর্বসম্মত কাজেই লিপি হিসেবে বিশ্বজনের কাছে এর পরিচিতিও বড় কম নয় যেমন ধরা যাক p (‘পাই’), যা একটি বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত --- এটি একটি মহাজাগতিক ধ্রুবক, মান 3.142

গ্রীক আর লাতিনের পরেই আসে কিরিলিক লিপির কথা এই লিপির মুল ব্যবহারকারী রুশ ও অন্যান্য বেশ কিছুস্লাভভাষা লিপিটি তৈরি হয়েছে মূলত গ্রীক ও কিছু রোমান লিপির সাথে স্লাভ ভাষার উপযোগী বিশিষ্ট কিছু বর্ণ যোগ করে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সুবাদে কিরিলিক লিপি স্লাভ ভাষার বাইরেও এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে সুপরিচিত বস্তুত অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ইউরোপের সব ভাষাই এই তিনটি লিপির কোন না কোন একটি ব্যবহার করে লেখা হয় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার দৌলতে বিশ্ব জুড়ে লাতিন লিপির বিস্তার ঘটেছে সবচেয়ে বেশি এটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লিপি

তবে বিশ্বের প্রধান প্রধান লিপিগুলির মধ্যে অ-ইউরোপীয় লিপিরাও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন আরবি লিপি। ইসলামের প্রভাবের ফলে পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে আরবি ভাষা ও লিপির ব্যবহার সমধিক আরবি ভাষা নিজে সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত, হিব্রু ভাষার আত্মীয়।  কিন্তু সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীর বাইরেও আরো অনেকে এই লিপি, বা তার পরিমার্জিত রূপ ব্যবহার করে থাকে। যেমন ইরানে ফার্সি, আফগানিস্তানে পুশতু ও দারি, ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধি, কাশ্মিরী, উর্দু, পাকিস্তানের ব্রুহুই (আংশিক, লাতিন বর্ণমালার পাশাপাশি), বালোচি, মধ্য এশিয়ার ইসলাম প্রভাবিত অনেকানেক ভাষাভাষী, চীনের উল্যিঘুর ...  ইত্যাদিশুধু ধর্মীয় নয়, এই লিপির বিস্তারে ভূমিকা রয়েছে পারস্য তথা ইরানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবেরও। ভারতে পঞ্জাবি ভাষা শাহমুখী, গুরুমুখী দুই লিপিতেই লেখা হয়। প্রথমটি ফার্সি-আরবি ও দ্বিতীয়টি ভারতী লিপি, অর্থাৎ ব্রাহ্মীর উত্তরসূরি হিন্দি/উর্দুও বস্তুতপক্ষে একই ভাষা, লেখা হয় আলাদা লিপিতে।

আরবি লিপির দৃশ্য্যরূপ তিনটি ইউরোপীয় লিপির তুলনায় একেবারেই আলাদা। লেখাও হয় উল্টো, অর্থাৎ ডানদিক থেকে বাঁদিকে। কিন্তু চারটি লিপির মধ্যে বৈসাদৃশ্য যতই থাক, খুঁটিয়ে দেখলে তাদের বর্ণমালার গঠনে পরিষ্কার সাদৃশ্য ধরা পড়ে। অর্থাৎ ভাষার দিক থেকে যতই ভিন্নতা থাক বা লিপির দৃশ্যরূপ যতই আলাদা হোক না কেন, গ্রীক আলফা-বিটা-গামা, লাতিন এ-বি-সি, কিরিলিক আ-বে-ভে এবং আরবি আলেফ-বে-তে ---- এই বর্ণমালাগুলি একে অপরের আত্মীয়। এদের প্রত্যেকেরই উৎস প্রাচীন ফিনিসিয় বর্ণমালা।

প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপি মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম। তার পরেই আসে প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফিকস। এই লিপিগুলির বয়েস প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর। (সিন্ধু সভ্যতার লিপিও অতটাই পুরনো, কিন্তু পাঠোদ্ধার হয় নি বলে তাকে হিসেবের বাইরে রাখতে হচ্ছে।) কিন্তু লিপি হলেও এরা ‘চিত্রলিপি’, অদর্থাৎ এদের কোন বর্ণমালা নেই। আধুনিক চীনা লিপিও তাই। সেখানে প্রতিটি ‘অক্ষর’ একেকটি পরিপূর্ণ শব্দ (word)অন্যদিকে একটি ভাষায় উচ্চারিত তাবৎ ধ্বনিপুঞ্জের মধ্য থেকে মৌলিক ধ্বনিগুলিকে চিহ্নিত করে সেগুলির প্রত্যেকটির জন্য এক একটি নির্দিষ্ট সাংকেতিক প্রতীক নির্ধারণ করা ও সেগুলিকে সুবিন্যস্ত করে ব্যবহারযোগ্য ভাবে উপস্থিত করা ---- এই হল ধ্বনিভিত্তিক (phonetic) বর্ণমালার ভিত্তি ঐতিহাসিক বিচারে প্রথম ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালা উদ্ভাবনের কৃতিত্ব ফিনিসিয়দের ফিনিসিয়রা বাণিজ্যে, বিশেষ করে সমুদ্র-বাণিজ্যে পটু আজ থেকে প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে আধুনিক লেবানন ও সিরিয়ার অনেকখানি অংশ জুড়ে তাদের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সম্ভবত বাণিজ্যের প্রয়োজনেই তাদের দ্রুত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য একটি ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালার প্রয়োজন হয়েছিল এই বর্ণমালা গঠনের আদত পদ্ধতিটি ছিল বেশ সোজাসাপ্টা ধরা যাক কোন একটি নির্দিষ্ট ধ্বনি বোঝাতে বেছে নেওয়া হল এমন একটি ফিনিসীয় শব্দ যার প্রথমেই উচ্চারিত হচ্ছে সেই ধ্বনিটি তারপর সেই শব্দটির অর্থ বোঝাতে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকসে যে লিপি বা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেই ছবি, বা তার সরলীকৃত রূপটি হয়ে উঠল ঐ বিশেষ ধ্বনির সঙ্কেতচিহ্ন, বা ‘বর্ণ’যেমন ফিনিসীয় ভাষায় ‘জল’ বলতে যে শব্দটি ব্যবহার হয় তার প্রথম ধ্বনিটি যদি হয় ‘ম্‌’, এই ব্যঞ্জনধ্বনি (‘অ-‘, এই স্বরধ্বনি বাদ দিয়ে), আর মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকসে ‘জল’ বোঝাতে আঁকা হয় ঢেউয়ের ছবি, তাহলে ‘M’ বা ‘m’, এই লাতিন বর্ণটির মধ্যে সেই ঢেউয়ের আভাস খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয় একই ভাবে হাতে লেখা ‘a’ –এই বর্ণটির মধ্যে লুকিয়ে আছে লম্বাটে এক ষাঁড়ের মুখ, আর ‘B’-এর মধ্যে বাড়ি (সূত্র : উইকিপিডিয়া, ফিনিসীয় বর্ণমালা)

এই সব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভারতী বর্ণমালার স্থান কোথায়? সেটি বুঝতে গেলে আগে ব্রাহ্মী বর্ণমালা ও লিপির ব্যাপারে কিছুটা খোঁজখবর নিতে হয়। প্রচলিত ইতিহাস বলছে ব্রাহ্মী লিপির প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে অশোকের শিলালিপিতে। সময়টা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক (আ. ২৫০ খ্রি. পূ. ও তার পর)আলেকজাণ্ডারের ভারত আক্রমণ খ্রি. পূ. ৩২৭ অব্দে, অর্থাৎ এর প্রায় ১০০ বছর আগে। কাজেই একটি বহুল প্রচলিত মত এই যে ভারতে লিপির উদ্ভব গ্রীসের থেকে। অর্থাৎ তার আগে ভারতে ভাষার কোন লিখিত রূপ ছিল না। কোন সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ছাড়া এই মত নিশ্চিত রূপে খণ্ডন করা কঠিন।  কিন্তু তা না হলেই যে লিপির অস্তিত্ব অপ্রমাণ হয়ে যায় তাও নয়। মেগাস্থিনিসের ‘ইণ্ডিকা’ খুব স্পষ্ট ভাবে বলছে যে সেই সময়ে পূর্ব ভারতে মগধকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল আর তা ছিল যথেষ্ট সুসংহত ও উন্নত। এত বড় একটা সাম্রাজ্যের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, প্রশাসনিক কাজকর্ম, সবই চলত মুখে মুখে, কোন লিখিত রূপ ছাড়াই ---- বিরুদ্ধবাদীরা এটা মেনে নিতে নারাজ। আবার গত কয়েক দশকে দক্ষিণ ভারত ও সিংহলের অনেক জায়গায় মৃৎপাত্রে, গুহালিপিতে, আবিষ্কৃত মুদ্রায়, তামিল-ব্রাহ্মী লিপির খোঁজ মিলেছে। এদের কোন কোনটি অন্তত ৩০০ খ্রি. পূ.-র বলে জানা গেছেকোন কোন মহল থেকে লিপিগুলি চারশ’ থেকে পাঁচশ’ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বলে অনুমান করা হলেও অন্যরা তা সমর্থন করেন নি। উইকিপিডিয়া অবশ্য বলছে ব্রাহ্মী লিপি তার চেহারা, তথা দৃশ্যরূপের জন্য ফিনিসিয় বর্ণমালার কাছে ঋণী। ওদিকে ব্রাহ্মী বর্ণমালার গঠন যে গ্রীক, লাতিন, ইউরোপীয় ও সেমিটিক অন্য যে কোন বর্ণমালার থেকে পৃথক তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। মোটের ওপর, বিতর্ক চলছেই।

কোথায় আলাদা আমাদের ভারতী বর্ণমালা? প্রথমেই মনে আসে এই বর্ণমালায় বর্ণের নাম ও উচ্চারণ অভিন্ন। রোমান লিপিতে ‘এল’ (‘L’) নামের বর্ণটির উচ্চারণ ‘ল্‌’, এই ব্যঞ্জনধ্বনি। অন্যদিকে ভারতী বর্ণমালা মোতাবেক ‘ল’ একইসাথে বর্ণটির নাম ও উচ্চারণএরই সূত্র ধরে বলতে হয় এই বর্ণমালায় প্রতিটি বর্ণই এক একটি ‘অক্ষর’ (syllable), অর্থাৎ বর্ণমালাটি ‘আক্ষরিক’, বা সিলাবিক’ (syllabic) দ্বিতীয়তঃ শুরুতেই স্বরধ্বনির সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বর্ণ (স্বরবর্ণ) এবং ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বর্ণ (ব্যঞ্জনবর্ণ) আলাদা করে দেওয়া হয়েছে ফলে নতুন শিক্ষার্থীর জন্য বিভ্রান্তির অবকাশ নেই তৃতীয়তঃ প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণকে, তার উচ্চারণের প্রকৃতি ও উচ্চারণস্থান অনুসারে, সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়েছে গাণিতিক নিয়ম মেনে অর্থাৎ ভারতীয় বর্ণমালায় প্রতিটি বর্ণের অবস্থান কার্য-কারণ সূত্র মেনে নির্ধারিত মোটেই তা এলোমেলো, অর্থহীন নয় কাজেই কোন খুদে বিচ্ছু যদি প্রশ্ন করে কেন A-র পরে B, তাহলে তার উত্তর দিতে পারব না ঠিকই কিন্তু কেন’-এর পরে’, তা নিয়ে কোন সংশয় নেই

মানুষের উচ্চারিত মূল স্বরধ্বনির সংখ্যা পাঁচটি লাতিন বর্ণমালা মোতাবেক তারা হল a, i, u, e, এবং o কিন্তু ভাষার মধ্যে, উচ্চারণের সময়ে, প্রতিটি স্বরধ্বনিরই বিপুল পরিমাণে বিস্তার, বিকার, বা পরিবর্তন ঘটে থাকে বস্তুত উচ্চারিত সমস্ত ধ্বনিকে, তার সমস্ত সূক্ষ্মতা সহ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে, হুবহু, বর্ণ-সঙ্কেতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ইংরেজি ভাষায় u স্বরবর্ণটি আ, , , ইয়ু, , …… ইত্যাদি নানা ভাবে উচ্চারিত হয়ে থাকে  স্বরধ্বনির বৈচিত্র্যকে জায়গা দিতে ভারতী বর্ণমালায় প্রতিটি স্বরধ্বনির জন্য হ্রস্ব ও দীর্ঘ, এই দুইটি করে পরস্পর সদৃশ, কিন্তু ভিন্ন, বর্ণের সংস্থান রাখা হয়েছে এ ছাড়া র্এবং ল্যেহেতু স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, দুইয়েরই লক্ষ্মণাক্রান্ত তাই, পক্ষপাতহীনভাবে,  তাদের প্রত্যেকের জন্য স্বর এবং ব্যঞ্জন, দুটি করে বর্ণের সংস্থান রাখা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্বরধ্বনি হিসাবে চিহ্নিত বর্ণ দুটি স্বরবর্ণের তালিকায় স্থান পেয়েছে এছাড়া  প্রথম বাশূন্যধ্বনিজ্ঞাপক স্বরবর্ণটি (‘’, যা প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণে স্বাভাবিক ভাবে যুক্ত) বাদ দিয়ে বাকি প্রতিটি স্বরবর্ণের জন্য একটি সম্পূর্ণ বর্ণের পাশাপাশি তদনুযায়ী একটি করে সংক্ষিপ্ত বর্ণ (-কার, ি-কার, ইত্যাদি) চিহ্নিত করা হয়েছে। তাতে স্বরধ্বনির জন্য মোট চিহ্নিত বর্ণের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও লেখার পক্ষে তা অনেক সংক্ষিপ্ত এবং সুবিধাজনকসেইসাথে স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে ভাষার উচ্চারিত ও লিখিত রূপের মধ্যে অনেকখানি সমতাও আনা গেছে।

আমরা জানি ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম পঁচিশটি বর্ণ ‘স্পর্শ বর্ণ’, যা সাজানো হয়েছে 5 х 5 এই ‘বর্গ ছক’, বা ম্যাট্রিক্সে। গণিতের নিয়ম মেনে সেই ছকের প্রতিটি সারি সেই বর্ণের উচ্চারণ স্থান, আর প্রতিটি স্তম্ভ সেই বর্ণের উচ্চারিত বিশেষ রূপটির পরিচয় দেয়। প্রথম স্তম্ভ সেই সারির বর্ণের মূল উচ্চারণ, পরবর্তী তিন স্তম্ভ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার বদলে যাওয়া উচ্চারণ, এবং পঞ্চম স্তম্ভ সংশ্লিষ্ট অনুনাসিক বর্ণটিকে নির্দেশ করে। রসায়নে যেমন পর্যায়-সারণীটি একবার ভালো করে শিখে নিলে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া বোঝা সহজ হয়ে যায়, এখানেও তেমনি এই ছকটি আত্মস্থ করতে পারলে বিভিন্ন বর্ণের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বহতা ভাষায় একটি ধ্বনির নানাভাবে বদলে যাওয়ার চালচিত্রটি ভারি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার জন্য এমনকি কোন ভাষাতাত্ত্বিক বা পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমরা যারা শিক্ষিত এবং নিজ ভাষায় স্বাক্ষর, তারা এই ছকটি শিখেছি সেই শিশুকালে কিন্তু শিখেছি কি? তাহলে এক বাংলার শিক্ষককে কেন হাহাকার করে বলতে হয় কলেজের অনেকখানি উঁচু ক্লাসে ওঠার আগে তিনি জানতেনই নাষ্ণযুক্তবর্ণটিষ্‌+নয়*! অনুমান করি তিনি ততটাও ব্যতিক্রম নন, এমনকি, দুর্ভাগ্যক্রমে, হয়তো সংখ্যালঘুও নন

পরবর্তী আটটি ব্যঞ্জনবর্ণ, তাদের প্রকৃতি অনুসারে দুইটি সারিতে চারটি করে সাজানো  এই অসমতার জন্যেই অনুমান করা যায় তারা ছকের বাইরে রয়ে গেছে। বাংলা বর্ণমালায় ‘হ’-এর পরের বর্ণগুলি কোনটিই মৌলিক বর্ণ নয়, বরং তারা কোন না কোন আগেকার ব্যঞ্জনবর্ণের পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন উচ্চারণ। অনেক সময়েই মূল বর্ণটির নিচে একটি বিন্দু বসিয়ে এই ভিন্নতা বোঝানো হয়েছে।

এই বর্ণসজ্জাটি ঠিক ঠিক বুঝবার জন্য আমাদের খুব চেনা বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণগুলিকে একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নিচের সারণীতে দেওয়া হল।

 

উচ্চারণপ্রকৃতি

®

অঘোষ

ঘোষ

অনুনাসিক

 

ঊষ্ম

অন্তঃস্থ

(অর্ধস্বর)

অন্যান্য

উচ্চারণস্থান

¯

অল্পপ্রাণ

মহাপ্রাণ

অল্পপ্রাণ

মহাপ্রাণ

কন্ঠ্য

...

তালব্য

য, য়

...

মূর্ধা

,

দন্ত্য

ওষ্ঠ্য

**

ব, (o)

...

 

 

 

 

(সংক্ষিপ্ত)

ঙ্‌ à

স্বর + নাসিক্য à

হ্‌ à

 

এখানে ** চিহ্নিত অংশটি ওষ্ঠ্য-উষ্ম বর্ণের জন্য। ভারতী বর্ণমালায় এটি অনুপস্থিত, কিন্তু এর হদিস মিলবে গ্রীক বর্ণমালায়, Y (প্‌সাই) এই বর্ণটির মধ্যে। এর ব্যবহার আমাদের পরিচিত “পিসি চলো যাই”, অর্থাৎ ইংরেজি সাইকোলজি (psychology) শব্দের বানানে বাংলায় অর্ধস্বর অন্তঃস্থ কখনো ’, কখনো ’ (প্রকৃত উচ্চারণ ইয়’, লাতিন প্রতিবর্ণীকরণে ‘y’) হিসাবে উচ্চারিত হয় আর অন্তঃস্থ ’ (দেবনাগরীতে o, প্রকৃত উচ্চারণ ওয়, লাতিন প্রতিবর্ণীকরণে w) বাংলায় ব্যবহৃত হয় না বলে সম্প্রতি বর্ণমালা থেকে বাদ গেছে

এই একই বর্ণমালা, অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় কিছুটা অদল বদল করে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন মরাঠি ভাষার বর্ণমালায় একটি বাড়তি ‘ল’ যোগ হয়েছে, যার উচ্চারণ         দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবে কিছুটা ‘কড়া’। মনে হয় এটি আমাদের ভুলে যাওয়া লি-কার (৯)-এর মত। আবার তামিল বর্ণমালায় কেবলমাত্র প্রথম ও পঞ্চম স্তম্ভের বর্ণরাই উপস্থিত, যেহেতু সেই ভাষায় ‘মহাপ্রাণ’, বা ‘ঘোষ’ ধ্বনি নেই। একই কারণে দক্ষিণী প্রতিবর্ণীকরণে ‘ট’ বোঝাতে T আর ‘ত’ বোঝাতে Th ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ দক্ষিণী নিয়মে Thiru –কে পড়তে হবে ‘তিরু’, ‘থিরু’ নয়। সচেতনতা আর সদিচ্ছা থাকলে এতদিনে সর্বজনবোধ্য এবং সর্বজনগ্রাহ্য অভিন্ন ভারতী লিপি (প্রশাসনিক ব্যবহারের জন্য) তৈরি করা অসম্ভব ছিল না। তাতে অন্তত চলতে ফিরতে লিপি-বিভ্রাটের হাত থেকে বাঁচা যেত।

সবশেষে বলি সংখ্যালিপির কথা। ভারতী বর্ণমালার সংখ্যালিপি প্রধানত তৈরি হয়েছে সেই ভাষার সংখ্যাবাচক শব্দের বর্ণগুলি থেকে। যেমন ‘১’ হল ‘এক’ এই শব্দে ‘ক’-এর শুঁড় (দ্র. সত্যজিৎ রায়ের “যখন ছোট ছিলাম”) অথবা ৩ হল অবিকল ‘তিন’ এই শব্দের মাত্রাছাড়া ‘ত’। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ভাবে মান্য 1,2,3, ... এই সংখ্যালিপিটি ইংরেজি তো নয়ই, লাতিনও নয়। লাতিন সংখ্যালিপি (I, II, III, ….)-তে শূন্যের ব্যবহার ছিল না। শূন্য এবং দশমিকের ব্যবহার ভারত থেকে শুরু হয়ে আরবদের হাত ঘুরে পৌঁছেছিল ইউরোপে। আর তাই এই ইউরোপীয়, তথা আন্তর্জাতিক সংখ্যালিপিও তৈরি হয়েছে আরবি আর ভারতী (ব্রাহ্মী) সংখ্যালিপির সমন্বয়ে। খেয়াল করলে দেখা যাবে আন্তর্জাতিক সংখ্যালিপির 2 আর 3, দেবনাগরী (দুই) আর (তিন)-এর সমতূল। আবার দেবনাগরী ‘চ’ আর ‘প’ (যথাক্রমে আর )-এর আভাস মেলে 4 5, এই সংখ্যা দু’টিতে। সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ এই আন্তর্জাতিক সংখ্যালিপি ব্যবহার করছেন, এবং নিজের নিজের ভাষায় সংখ্যাগুলি উচ্চারণও করছেন ---- বিন্দুবিসর্গ ইংরেজি ছাড়াই। কিন্তু কী এক নিগূঢ় কারণে, আমাদের দেশে, 1,2,3, .... সব সময়েই য়ান, টু, থ্রি বলে পড়ার নিয়ম। ফলে দেশ জুড়ে সংখ্যামাত্রই ইংরেজি সংখ্যা। দৈবাৎ নিজের ভাষায় কোন সংখ্যা বললে আবার তা সহজ করে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতে হয়। না হলে বিভ্রান্তি বাড়ে।

তা আর দু’ পাঁচশ বছর এরকম চললে পণ্ডিতেরা এরপর প্রমাণ করে দেবেন যে ভারতবর্ষে সংখ্যার ধারণা এসেছে ব্রিiটিশদের হাত ধরে। তার আগে এদেশে সংখ্যাবাচক কোন শব্দ ছিল না।

অলমিতি বিস্তরে

ঋণস্বীকার :---

ক) “ধর্ম, ভাষা, রাজনীতি...  এবং বিজ্ঞান”,  অমৃত রেণু ঘোষ

খ) “ইংরেজি কী ও কেন”, অমৃত রেণু ঘোষ

গ) “মেঘদূত”, বুদ্ধদেব বসু

ঘ) “যখন ছোট ছিলাম”, সত্যজিৎ রায়

ঙ) আন্তর্জাল :---  গুগল, উইকিপিডিয়া

(https://glossographia.com/2008/09/15/on-western-numerals)

 

*[টীকা :--- ষ (৩য় সারি, মূর্ধা) ও ঞ (২য় সারি, তালব্য), শাস্ত্রমতে (এবং ব্যাকরণ মতে) এরা ‘অসবর্ণ’, অতএব এদের ‘মিলন’ (যুক্তাক্ষর) অসিদ্ধ (সারণী দ্রষ্টব্য)।  তবে কেন ষ্ণ-এর পিঠে ঞ-র বোঁচকা ? প্রথমত লিপি-সৌকর্য, দ্বিতীয়ত তালপাতার পুঁথিতে হাতের কলম না তুলে একটানা সাবলীল, দ্রুত গতিতে লিখে যাওয়ার সুবিধা। এই কারণে ‘ণ’ তার প্রতিবেশি (একই স্তম্ভ, অনুনাসিক) ঞ-র বোঁচকাটি ধার নিয়েছিল। নিয়মের বালাই শ্রাব্য, অর্থাৎ ধ্বনিরূপে যতটা, দৃশ্যরূপে ততটা নয়।]

(প্রথম প্রকাশ : “ক্লেদজ কুসুম”, বর্ষ-৪৫ (নব পর্যায়, বর্ষ – ৩১) ; গ্রীষ্ম-বসন্ত ১৪৩২,  ইং ২০২৫-২৬)

 

 


1 টি মন্তব্য:

  1. ভাষা, লিপি, বর্ণ, হরফ - পার্থক্যটাই পরিষ্কার ছিল না। তাই লেখাটা পড়ে আমার মত নিরেট অনেকটাই আলোকিত হল 😌

    উত্তরমুছুন