সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

মধুবন চক্রবর্তী

 

রাগের অন্তরে অনুরাগকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল

 


রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিতে বিভিন্ন রাগরাগিণীর ব্যবহার সংগীতের এই দুই প্রধান ধারাকে আরও অপার্থিব সুন্দর করেছে। দিয়েছে এক আভিজাত্য, ঐতিহ্য। নির্মাণ করেছে নতুন নির্মাণ শৈলী। যে বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে, সেটি হল রাগের প্রয়োগ, গানের অন্তর্নিহিত ভাব বা এক্সপ্রেশন। যা সংগীতের সুবিশাল বেলাভূমিতে ঝিনুকের ভেতরে মুক্ত কুড়াতে সাহায্য করেছে। যদিও দুজনের সৃষ্টির মধ্যে ভাবের তারতম্য লক্ষ্যণীয়। তবুও রাগ সঙ্গীতের ব্যবহারিক প্রয়োগে কাজী নজরুল ইসলামের গান হয়ে উঠেছে, উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও উপশাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারার মেলবন্ধন। কাজী নজরুল ইসলাম যে সমস্ত আঙ্গিকে তাঁর গানগুলি রচনা করেছেন, তার মধ্যে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আঙ্গিক যেমন আছে, তেমিনি আছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, কীর্তন, লোকসংগীত যেমন ঝুমুর, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, লেটো, আলকাপ, রামপ্রসাদী। আধ্যাত্মসঙ্গীতের মধ্যে শ্যামাসঙ্গীত, ভক্তিগীতি প্রমুখ। নজরুল ইসলাম তার আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করে সেই অনুযায়ী ভাব ও অনুভূতি সমন্বয় বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় দিব্য ভাবের সংগীত রচনা করেছেন।।

যেরকম কৃষ্ণের দেহতত্ত্ব বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন

"আমি কৃষ্ণচূড়া হতাম যদি

হতাম ময়ূর পাখা

তোমার বাঁকা চূড়ায় শোভা পেতাম

হলে কদম শাখা""...

আবার একই রূপ রসের বর্ণনা করেছেন ইসলামী সংগীতে

আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ

এই পথে মোর চলে যেতেন

নূর নবী হজরত"…

কীর্তন, বাউল, শ্যামাসংগীত, ভজন অর্থাৎ ভক্তি সংগীত, বাংলা হিন্দি রাধা কৃষ্ণের লীলা মাহাত্ম্য, বাল্য গোপাল, হিন্দু সম্প্রদায়ের সমস্ত দেবদেবীর নামে অভিহিত করেছেন এমনকি আধ্যাত্মিক মনীষীদের জীবনী পর্যালোচনা করে সংগীত সৃষ্টি করেছেন। আর এই সমস্ত সংগীতের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  রাগরাগিণীর কি অসম্ভব সুন্দর মিশ্রণ ঘটিয়েছেন তিনি। সৃষ্টির বিপুলতার দিক থেকে নজরুল শুধু আন্তর্জাতিক নন। সর্বকালের সেরা কবি, গীতিকার, সুরকার, হিসেবে বিশ্বের দরবারে জায়গা করে নিয়েছেন।

আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগীতের অনন্ত যাত্রাপথে অসংখ্য গান রচনার মধ্যে বহু গানে রাগরাগিণীর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন অত্যাশ্চর্যভাবে। যেখানে রাগ রাগিণীর প্রকটতা কাজী নজরুলের গানের রাগের ব্যবহারের তুলনায় অনেক কম। যে রাগরাগিণীকে আমরা পেয়েছি, তানসেন, সদারঙ্গ, যদুভট্টের ধ্রুপদ, খেয়ালে, উচ্চাঙ্গসংগীতে-‌কঠোর অনুশাসনের বন্দীশবাঁধা_ আরোহন অবরোহনের সীমানা ঘেরার মধ্যে , তারাই আবার স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে মুক্ত আকাশে বিহঙ্গ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানে। ঐতিহ্যের প্রথা ভেঙে এমন সব স্বরবিন্যাসের আমদানি করেছেন যা, প্রথাগতভাবে সম্ভব নয়। সেই মুন্সিয়ানা একমাত্র কবিগুরুই দেখাতে পেরেছিলেন সেই সময়। "

ছেলেবেলায় কয়েকটি গান শিখেছিলাম তার মধ্যে একটি গানের কথা খুব মনে পড়ছে রবীন্দ্র সংগীত 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই'… গানটি বেহাগের সুরে বাধা। আবার 'চিরসখা ছেড়ো না' এই গানটিও বেহাগের সোহাগে পরিপূর্ণ। কোথাও বেহাগ ছাপিয়ে যায়নি গানের বাণী, সুর, ও রাগের ভাবকে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গানের চরিত্রগুলো কিরকম বদলাতে থাকে। আবার ধরুন " পূরবী " রাগে 'আজি এ আনন্দ সন্ধ্যা' - এই গানটি  যখন ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, মনে এক অপূর্ব সন্ধ্যার সৌন্দর্য ঘনীভূত হত।। আসলে গানের বাণীর গুরুত্ব যেখানে অপরিসীম, সেখানে রাগের ভাবের বিস্তার যেন তার থেকেও বেশি। ভাবের পক্ষ বিস্তারের সুবিধার্থে এমনকি ভাবের মূল উৎসকে উৎসাহিত করতে গিয়ে, রাগে বর্জনীয় স্বরগুলিকেও তিনি গৃহহীন করেননি। রবীন্দ্রনাথ সেখানেও রসোত্তীর্ণ করেছেন তাঁর রচনাকে, সৃষ্টিকে। সৌন্দর্যের তাগিদে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত স্বর প্রয়োগে রাগের ভাব ক্ষুণ্ন হতে পারে, সেই ভেবে তিনি কোনোও কোনোও গানে রাগের আধিক্যকে বর্জন করেছেন।

ভারতীয় ঐতিহ্যগত সংগীতের অন্তর সাধনা সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন

দিলীপ কুমার রায়কে। বলেছিলেন--

"হিন্দুস্তানি সংগীত ভালো করে শিখলে তা থেকে আমরা লাভ না করেই পারব না। তবে এ লাভটা হবে তখনই, যখন আমরা তাদের দানটা যথার্থ আত্মসাৎ করে তাকে আপনরূপ দিতে পারব। তর্জমা করে বা

ধার করে সত্যিকার রস সৃষ্টি হয় না সাহিত্যেও না, সঙ্গীতেও না"। অর্থাৎ হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা বারবার আমরা দেখেছি। শুধু তাই নয় তিনি যে আন্তরিকভাবে মৌলিকতায় বিশ্বাসী, সৃষ্টিশীল মানুষ এই কথাতেই তার প্রমাণ। অন্ধ অনুকরণ নয়, সংগীতের ধার এবং ভারকে তিনি গ্রহণ করতে বলছেন এবং অবশ্যই শেখার দিকটিও উল্লেখ করেছেন। এবং না শিখলে যে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীতের অপার সৌন্দর্য, সেই সৌন্দর্য থেকে আমরা বঞ্চিত হব সেটাও তিনি বলছেন। রাগ-রাগিণীর 'ভাব " বা রসটুকু গ্রহণ করে তাকে আপন রূপ দিতে বলেছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যায়,

রবীন্দ্রনাথের দশ শতাংশ গান সম্পূর্ণরূপে রাগ নির্ভর। আর বাকি গানগুলি ৭৫ শতাংশ। এর আবরণ বা সাজগোজ নির্ভর করছে রাগ প্রয়োগের উপরে।

তাই কবি বলছেন--"যতই দৌরাত্ম করি না কেন, রাগ রাগিণী এলাকা একেবারে পার হইতে পারি নাই। দেখিলাম তাদের খাঁচাটা এড়ানো চলে, কিন্তু বাসাটা তাদেরই বজায় থাকে"। রাগের কঠোর অনুশাসন নয়, অন্তর্নিহিত যে ভাব ও রস, তাকেই তিনি গানের মধ্যে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। আর এখানেই তিনি অন্যান্য গীতিকারদের থেকে এতটাই স্বতন্ত্র। তার এই অনুভবের নিদর্শন হিসেবে যে গানগুলির কথা বলা যায় সেগুলি হল "সকালবেলার আলোয় বাজে

বিদায়ব্যথার ভৈরবী

সকরুণ বেনু বাজায়ে কে যায়"

আনন্দোজ্জ্বল গানগুলির মধ্যে একটি হলো "বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো"...

এই প্রসঙ্গে কবি'--

"সংগীতের উদ্দেশ্য ' নামক প্রবন্ধে বলেছেন যে "যদি মাধ্যমের স্থানে 'পঞ্চম ' হলে ভাল শোনায়, আর তাহাতে বর্ণনীয় ভাবের সহায়তা করে, তবে জয়জয়ন্তী বাঁচুন বা মরুন, আমি পঞ্চম কেই বহাল রাখিবো না কেন?"

এ প্রসঙ্গে আরোও বলেছেন...

"সঙ্গীত কৌশল প্রকাশের প্রধান নহে,

ভাব প্রকাশের স্থান। যতখানিতে সাহায্য করে ততখানিই সংগীতের অন্তর্গত"...

কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম গোড়ারদিকে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন ঠিকই। হয়তো সেই কারণেই অনেক গানই সেইসময় কথাপ্রধান। চারটি তুকের প্রভাব দেখা যায় প্রথমদিকের গানে। কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে তিনি যখন শাস্ত্রীয় সংগীতের সৌন্দর্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তখন বিবিধমুখী গান লিখেছেন। তখন আর তুকের এই বিভাগ রক্ষা করেননি। বিশেষ করে প্রভাবিত হয়েছিলেন খেয়াল আর ঠুমরি দ্বারা। যত দিন গেছে, রবীন্দ্রনাথ ততই শাস্ত্রীয় বন্ধন কাটিয়ে নিজের মতন করে সৃষ্টি করেছেন। রাগসঙ্গীতের ভাবটুকু নিয়ে বাকিটুকু বর্জন করেছেন।

অপরদিকে যতদিন গেছে সুবদ্ধ সংগীতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কাজী নজরুলের, ততই শাস্ত্রীয় বন্ধন স্বীকার করেছেন বারবার। তাঁর অনেক গান বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, সুর সৃষ্টি করার জন্যই যেন গান লেখা। গান লেখার জন্য সুর সৃষ্টি নয়। তার রাগভিত্তিক গানে রাগের অপার্থিব সৌন্দর্য যেমন ধরা দিয়েছে গানের মধ্যে তেমনই রাগের বিস্তার ও আলাপের স্বাধীনতা কখনো ক্ষুন্ন হয়নি শিল্পীর।

সূত্র ('বাংলা গানের ইতিহাস  হাজার বছরের সংস্কৃতি')

ভারতীয় রাগ সংগীত সীমার মাঝে অসীম। মালকোষ, ইমনকল্যাণ, ভৈরবী, রুপালি, ভূপালি, ভৈরবীর নতুন নতুন দিক ও ভূমি আবিষ্কৃত হয়েছে যুগে যুগে, কালে কালে। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাহমান ধারায় যেন গা ভাসিয়েছিলেন প্রিয় কবি, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা কাজী নজরুল ইসলাম। পরবর্তী ক্ষেত্রে আরও অনেক কিংবদন্তি রাগ সংগীতের সৌন্দর্যকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন ঠিকই, কিন্তু নজরুল যেন ব্যতিক্রমী। শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম দর্শন হলো নির্দিষ্ট সুর কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন কোণ থেকে কেন্দ্রীয় আবেদন প্রকাশ করা ।যেমন কাজী নজরুলের 'আমি সুন্দর নহি জানি হে বন্ধু জানি' ও 'নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে'  দুটো গানই বেহাগের উপর রচিত। শুরুতেই বেহাগের উপর রচিত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা বলেছিলাম 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে' দুই কিংবদন্তির বেহাগের প্রয়োগকে লক্ষ্য করে দেখবেন। যেখানে রবীন্দ্রনাথ রাগের ভাবটুকু গ্রহণ করেছেন। আবার কাজী নজরুল ইসলাম বেহগের শুধু ভবটুকু নয়, গ্রহণ করেছেন রাগের বিস্তার, অলঙ্কার, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রচলিত আঙ্গিক। প্রয়োজনে শিল্পী স্বাধীনভাবে বিস্তার ঘটতে পারেন রাগরূপটির। কাঠামোকে এক রেখে।  উন্মোচিত করেছেন বাংলা গানের নিজস্ব সংস্কৃতি। নিজস্ব স্থাপত্য। বিভিন্ন রচনায় নজরুল তার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

বাংলা ভাষাতেও ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা রচনা করা সম্ভব এবং গাওয়া সম্ভব। সেটা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন নজরুল। রচনা করেছেন, সৃষ্টি করেছেন বাঙালির এক নিজস্ব সঙ্গীত নজরুলগীতি। যদিও উত্তর ভারতীয় খেয়াল, ঠুমরির যে মেজাজ, তার ছায়াকে বজায় রেখে ভিন্ন প্রচলিত আঙ্গিকে রাগের বিস্তার ঘটিয়ে ভিন্ন মেজাজ তৈরি করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা গানে শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারাকে নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রয়োগ করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগাশ্রিত গানগুলির নজরুল তিনভাবে সুর প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

প্রথমত.. বিশুদ্ধ রাগের আধারে এক নতুন ভাবের জন্ম দিয়েছেন।

যেমন 'অরুণ কান্তি কে গো যোগী ভিখারী'

দ্বিতীয়তঃ এক রাগের সঙ্গে অন্য রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন অনুভূতির জন্ম দিয়েছেন সঙ্গীতে। যথা 'জানি জানি প্রিয় এ জীবনে মিটিবে না সাধ'.. এখানে ভৈরবী এবং ভীমপলশ্রীর অসাধারণ মিশ্রন ঘটিয়েছেন।

তৃতীয়তঃ এক আঙ্গিকের সঙ্গে অন্য আঙ্গিকের মেলবন্ধন যেমন 'থৈ থৈ জলে ডুবে গেছে পথ' - লোকগীতির সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতের মেলবন্ধন। শাস্ত্রীয় সংগীতের আধারে রচিত নজরুল গীতির মধ্যে অভিনবত্ব হলো আধ্যাত্বিক দর্শনের প্রভাব। কাজী নজরুল নিজেই রচনা করেছেন রাগরাগিনী। শ্রেষ্ঠ কয়েকটি রাগ যেমন দোলনচাঁপা, অরুন ভৈরবী, শিবানীভৈরবী, রুদ্রভৈরব, যোগিনী, নীলাম্বরী প্রভৃতি। এই রাগগুলোর আধারে একটি করে গান রচনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যা আমাদের এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যায়।

নিয়ে যায় ভাবের উত্তুঙ্গ শৃঙ্গে।

আবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাগমিশ্রণের মধ্যে দিয়ে তৈরি করেছেন এক নব অধ্যায়। বিভিন্ন রাগ এবং তার যথাযথ প্রয়োগের ক্ষমতা ছিল তাঁর অসীম। কিন্তু ভাবকে প্রাধান্য দিয়েছেন বারবার। আবারও সেই বেহাগের কথায় আসি। '"আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে'..অথবা 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে'। রাগের প্রয়োগ কখনোওই একবারের জন্যও দুটি গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে ক্ষুণ্ণ করেনি। রবীন্দ্রনাথের পূজা প্রেম পর্যায়ের গানের মধ্যেই লক্ষণীয় রাগের রাগারাগি বাড়াবাড়ি একেবারেই নেই সেখানে শুধুই রয়েছে রয়েছে আত্মনিবেদন আত্মসমর্পণ। রাগরাগিণীর বিষয়ে আলোচনা করার সময় রবীন্দ্রনাথের এক জায়গায় বলেছেন, গানের কাগজে রাগরাগিণীর নাম নির্দেশ না থাকাই ভালো। নামের মধ্যে তর্কের হেতু থাকে। রুপের মধ্যে থাকেনা। কোন রাগীনি গাওয়া হচ্ছে বলার কোন দরকার নেই।

কি গাওয়া হচ্ছে সেটাই মুখ্য কথা।

নামের সত্যতা দশের মুখে। সেই দশের মধ্যে মনের মিল নাও থাকতে পারে।

এই কথাগুলোর মধ্যে পরিষ্কার

রবীন্দ্র সঙ্গীতের রাগ রাগিনীকে গ্রহণ করা হয়েছে ভাবের দ্যোতক হিসেবে। এক্ষেত্রে রাগ ভাব প্রকাশের প্রধান অবলম্বন।

এবার আসি বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী হার্বাট স্পেন্সার এর কথায় ১৮৮০ সালে বিলেত থেকে ফেরার পর, হার্বার্ট স্পেন্সারের এক প্রবন্ধ "অরিজিন এন্ড ফাংশন অফ মিউজিক" পাঠ করে সমৃদ্ধ হন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। সংগীত সম্পর্কে নতুন ভাবনা জেগে ওঠে তার মধ্যে এবং হৃদয়ের ভাব সঙ্গীত এর মাধ্যমে কিভাবে সহজে প্রকাশ করা যায় সেই বিষয়টিও তাকে গভীরভাবে ভাবায়। চিন্তার ক্রিয়াত্মক রূপ ফুটে ওঠে গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যগুলিতে। হার্বাট স্পেনসর যিনি ধ্রুপদী উদারতাবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। কখনোই নিজেকে বস্তুবাদী ভাবতেন না। বরং তাঁর রচনায় unknowable এর কথা ছিল।  matter  energy কে সংস্কৃতির বিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিতেন। রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় স্পেনসরের বড় প্রভাব পাওয়া যায়, স্পেনসরের সামাজিক বিবর্তনের তত্ত্ব থেকে। জগৎ ও জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিবর্তনের প্রিয়াকে স্বীকার করে নেওয়ার সামগ্রিক বিশ্বাস থেকে রবীন্দ্রনাথের সংশ্লেষক দর্শন। (সূত্র প্রভাস.com)

স্পেনসর বলেছিলেন, সঙ্গীত শুনে যে অব্যাবহতি পাওয়া যায় বা সুখ পাওয়া যায় সেটা সাধন করা সংগীতের কাজ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন তুলেছিলেন, সংগীতে কি শুধু আমোদ হয়? ভালো সংগীত শুনলে আমাদের হৃদয়ে যে একটু সুখ অপরিস্ফুট আদর্শ জগত মায়াময়ী মরীচিকার  প্রতিবিম্বিত হইতে থাকে ইহাই তাহার কারণ। এটাই ছিল স্পেনসরীয় মত। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন এমন একদিন আসবে যখন এই কথা বলব দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন 'আমাদের দেশের সংগীত এমনই শাস্ত্রগত, ব্যাকরণগত অনুষ্ঠানগত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিকতা থেকে এত দূরে চলে গেছে যে, অনুভবের সঙ্গে সংগীতের বিচ্ছেদ হয়েছে। সংগীত কেবল সুর সমষ্টির কদম এবং তাতে রাগরাগিণীর ছাঁচ মাত্র অবশিষ্ট আছে'। বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ কখনোওই সংগীতকে ব্যাকরণগত বা স্বাস্থ্যগত দিক থেকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি গুরুত্ব দিয়েছেন ভাব প্রকাশের বিষয়টিকে। স্পেন্সার  ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই সংগীতের নতুন সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলেন। স্পেনসরের চিন্তার মধ্যে বিবর্তনবাদী ভাবনার প্রকাশ পায়। কাব্যচিত্র ও ভাস্কর্য অপেক্ষা শিল্প হিসেবে সঙ্গীতকে সর্বোচ্চ ভেবেছেন দুজনে। রাগপ্রকাশের যান্ত্রিকতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উভয়। রবীন্দ্রনাথ যেখানে স্পেনসর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। রাগ প্রকাশের যান্ত্রিকতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, নজরুল ইসলাম সেখানে নবাব আলী চৌধুরীর রচনায়, 'ম আরিফিন নাগমাত ও ফার্সি ভাষায় রচিত আমির খসরুর বিভিন্ন বই পড়তেন। সেগুলোর সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন রাগ আয়ত্ত করতেন। হারানো বহু রাগ নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। শুধু প্রাচীন রাগরাগিনীই নয়, নিজ সৃষ্ট রাগের রূপ রস গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছেন সংগীতের বিস্তারে। রাগের যান্ত্রিকতা তিনিও চাইতেন না, তবে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্তরে যে ঈশ্বর আছে তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

বৃহদ্দেশির রচয়িতা মতঙ্গ মুনি নাদকে ব্রহ্ম স্বরূপের সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছেন। সংগীতকে আমরা ব্রহ্মবিদ্যাও বলে থাকি। এছাড়া ক্রিয়াত্মক দিক থেকে গীত বাদ্য নৃত্যের মেলবন্ধনই তো সংগীত। বর্ণনা এমন নৃত্যগীতবাদিত্রবচ্চ।

বিশিষ্ট ইউরোপীয় পন্ডিত মনিয়ার উইলিয়ামস সংগীতের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন, Music is the Art or science of singing with music and dancing,

it is sung in chorus or harmony..

যেমন 'মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয় কোমল বন মাঝে'। এখানে এক অধরা মাধুরীর কথা বলেছেন কবি। 'না চাহিলে যারে পাওয়া যায়', এই গানটিতেও সেই অধরা অন্তর্যামীর কথা বলেছেন তিনি। তাঁর কবিতা ও গানের মধ্যে বিন্দু বিন্দু মুক্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্তর্যামী হয়ে। সেখানেও শতদল। বেদনা এবং সৃষ্টির মধ্যে এক সুন্দর সম্পর্ক আছে যে রকম নৃত্যের তালে তালে এই গানটিতে নটরাজ মানবের অন্তরাকাশে যে রস সৃজন করছেন, সেখানেও বীনাবাদিনীর মানাসলোক জুড়ে গানটি। অর্থাৎ রবীন্দ্রগানে বা কবিতায় বারেবারে ঈশ্বর ভাবনার মূল তত্ত্বটি প্রকাশ পেয়েছে।   হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত, উপশাস্ত্রীয় সংগীত, লোকসংগীত বা বিভিন্ন ধারার সংগীতের ধর্মই তাঁর ভাব ও রস রক্ষা করা। এই ভাব  বা expresssioner মধ্যেই ঈশ্বরকে অনুভব করেন সৃষ্টিকর্তা।

আবার কাজী নজরুল ইসলামের গানেও আমরা সেই ঈশ্বর অনুভূতির অনন্য দৃষ্টান্ত পাই। যেমন 'অন্তরে তুমি আছো চিরদিন ওগো অন্তর্যামী' কিংবা 'সৃজনও ছন্দে আনন্দে নাচ নটরাজ হে মহাকাল' কিংবা 'খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে', সব মিলিয়ে নজরুল গীতিতেও সেই আত্মসমর্পণের আহ্বান।

যায়, বিষয়ে কামনা না করেও বিষয় ভোগ করা যায়, ফল কামনা না করেও কর্ম করা যায় এবং শ্রী গীতার উপদেশ তাই কর্তব্য। কামনাই অর্থের মূল। তাকে শাস্ত্রে হৃদয়গ্রন্থি বলে। আর এই গ্রন্থি ছিন্ন করতে পারলেই মৃত মানুষ অমর হয়ে উঠতে পারে।

ভক্তিপথে সেই মাধ্যম... যে পথে ত্যাগ আছে। শান্তি আছে। ভক্তি পথে এগিয়ে গেলে, একমাত্র তাঁর স্মরণ হলে তার কৃপায় হৃদয় গ্রন্থি ক্রমে শিথিল হয়। জীবন মধুময় হয়। আর এই ভক্তিপথ সুগম হয় সংগীতের মধ্যেই। ঈশ্বর সাধনার শ্রেষ্ঠ উপায়।

ঈশ্বরানুভূতি গাঢ় হয়ে ওঠে সংগীত সাধনায়। সংগীতের ধর্ম ভাব যেখানে লুকিয়ে আছে ভক্তি। এই ভক্তি পথেই ঈশ্বর চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ সংগীত সৃষ্টির প্রথম পর্বে যে গান রচনা করেছিলেন তার বেশির ভাগই ছিল ব্রহ্মসংগীত।ভগবত ভাব আশ্রিত গান। শুদ্ধ রাগাশ্রিত গান। যেখানে অলংকরণ নেই। কোনও বাহুল্য নেই। যেমন ইমন রাগে

'হে মোর দেবতা' অথবা বেহাগ রাগে 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে' কিংবা কেদার রাগে 'প্রভু আমারও প্রিয় আমারো' এই গানগুলিতে ঈশ্বরঅনুভূতি প্রাঞ্জল।

রবীন্দ্রযুগে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদগ্ধ যুগান্তকারী কবি, সুরকার এবং সুগায়কের সঙ্গে, তাদের শিল্প সৃষ্টির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে থাকি। অনুভব করলেও এ কথা বলতে আমরা দ্বিধাবোধ করব না যে, তাঁদের সৃষ্টিতে রবীন্দ্র ভাবধারা ও গভীরতা ভীষণভাবে দেখা যায়।

কাজী নজরুল ইসলাম এই সত্যতা নিজের জীবন সাধনায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু রূপেই স্বীকার এবং সম্মান দিয়েছেন। যদিও এই পঞ্চকবির গানের মধ্যে স্বকীয়তা বিরাজ করছে। কিন্তু ভক্তি পথের মধ্যে দিয়েই তাঁরা এগিয়েছেন। সমৃদ্বৃহদ্দেশির রচয়িতা মতঙ্গ মুনি নাদকে ব্রহ্ম স্বরূপের সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছেন। সংগীতকে আমরা ব্রহ্মবিদ্যাও বলে থাকি। এছাড়া ক্রিয়াত্মক দিক থেকে গীত বাদ্য নৃত্যের মেলবন্ধনই তো সংগীত। বর্ণনা এমন নৃত্যগীতবাদিত্রবচ্চ।

বিশিষ্ট ইউরোপীয় পন্ডিত মনিয়ার উইলিয়ামস সংগীতের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন, Music is the Art or science of singing with music and dancing,

it is sung in chorus or harmony..

যেমন 'মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয় কোমল বন মাঝে'। এখানে এক অধরা মাধুরীর কথা বলেছেন কবি। 'না চাহিলে যারে পাওয়া যায়', এই গানটিতেও সেই অধরা অন্তর্যামীর কথা বলেছেন তিনি। তাঁর কবিতা ও গানের মধ্যে বিন্দু বিন্দু মুক্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্তর্যামী হয়ে। সেখানেও শতদল। বেদনা এবং সৃষ্টির মধ্যে এক সুন্দর সম্পর্ক আছে যে রকম নৃত্যের তালে তালে এই গানটিতে নটরাজ মানবের অন্তরাকাশে যে রস সৃজন করছেন, সেখানেও বীনাবাদিনীর মানাসলোক জুড়ে গানটি। অর্থাৎ রবীন্দ্রগানে বা কবিতায় বারেবারে ঈশ্বর ভাবনার মূল তত্ত্বটি প্রকাশ পেয়েছে।   হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত, উপশাস্ত্রীয় সংগীত, লোকসংগীত বা বিভিন্ন ধারার সংগীতের ধর্মই তাঁর ভাব ও রস রক্ষা করা। এই ভাব  বা expresssioner মধ্যেই ঈশ্বরকে অনুভব করেন সৃষ্টিকর্তা।

আবার কাজী নজরুল ইসলামের গানেও আমরা সেই ঈশ্বর অনুভূতির অনন্য দৃষ্টান্ত পাই। যেমন 'অন্তরে তুমি আছো চিরদিন ওগো অন্তর্যামী' কিংবা 'সৃজনও ছন্দে আনন্দে নাচ নটরাজ হে মহাকাল' কিংবা 'খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে', সব মিলিয়ে নজরুল গীতিতেও সেই আত্মসমর্পণের আহ্বান।

সংগীত গীতা শাস্ত্র কি বলে ধর্ম নিয়ে। ত্যাগই প্রধান ধর্ম। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, 'গীতা' এই শব্দটি বারবার উচ্চারণ করলে 'ত্যাগী' এই শব্দটি উচ্চারিত হবে। অর্থাৎ ধর্মের প্রথম কথা ত্যাগ স্বীকার করা। ত্যাগ অর্থ কামনা বাসনা ত্যাগ, আসক্তি ত্যাগ। আসক্তি, সুখদুঃখাদি চিত্ত চাঞ্চল্যের কারণ। সংসার আসক্তি ত্যাগ করেও, সংসার করা যায়, বিষয়ে কামনা না করেও বিষয় ভোগ করা যায়, ফল কামনা না করেও কর্ম করা যায় এবং শ্রী গীতার উপদেশ তাই কর্তব্য। কামনাই অর্থের মূল। তাকে শাস্ত্রে হৃদয়গ্রন্থি বলে। আর এই গ্রন্থি ছিন্ন করতে পারলেই মৃত মানুষ অমর হয়ে উঠতে পারে।

ভক্তিপথে সেই মাধ্যম... যে পথে ত্যাগ আছে। শান্তি আছে। ভক্তি পথে এগিয়ে গেলে, একমাত্র তাঁর স্মরণ হলে তার কৃপায় হৃদয় গ্রন্থি ক্রমে শিথিল হয়। জীবন মধুময় হয়। আর এই ভক্তিপথ সুগম হয় সংগীতের মধ্যেই। ঈশ্বর সাধনার শ্রেষ্ঠ উপায়। ঈশ্বরানুভূতি গাঢ় হয়ে ওঠে সংগীত সাধনায়। সংগীতের ধর্ম ভাব যেখানে লুকিয়ে আছে ভক্তি। এই ভক্তি পথেই ঈশ্বর চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ সংগীত সৃষ্টির প্রথম পর্বে যে গান রচনা করেছিলেন তার বেশির ভাগই ছিল ব্রহ্মসংগীত। ভগবত ভাব আশ্রিত গান। শুদ্ধ রাগাশ্রিত গান। যেখানে অলংকরণ নেই। কোনও বাহুল্য নেই। যেমন ইমন রাগে

'হে মোর দেবতা' অথবা বেহাগ রাগে 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে' কিংবা কেদার রাগে 'প্রভু আমারও প্রিয় আমারো' এই গানগুলিতে ঈশ্বরঅনুভূতি প্রাঞ্জল।

রবীন্দ্রযুগে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদগ্ধ যুগান্তকারী কবি, সুরকার এবং সুগায়কের সঙ্গে, তাদের শিল্প সৃষ্টির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে থাকি। অনুভব করলেও এ কথা বলতে আমরা দ্বিধাবোধ করব না যে, তাঁদের সৃষ্টিতে রবীন্দ্র ভাবধারা ও গভীরতা ভীষণভাবে দেখা যায়।

কাজী নজরুল ইসলাম এই সত্যতা নিজের জীবন সাধনায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু রূপেই স্বীকার এবং সম্মান দিয়েছেন। যদিও এই পঞ্চকবির গানের মধ্যে স্বকীয়তা বিরাজ করছে। কিন্তু ভক্তি পথের মধ্যে দিয়েই তাঁরা এগিয়েছেন। সমৃদ্ধ করেছেন সংগীতকে।

সংগীতকে আমরা ব্রহ্মবিদ্যাও বলে থাকি। এছাড়া ক্রিয়াত্মক দিক থেকে গীত বাদ্য নৃত্যের মেলবন্ধনই তো সংগীত।

বর্ণনা এমন নৃত্যগীতবাদিত্রবচ্চ।

বিশিষ্ট ইউরোপীয় পন্ডিত মনিয়ার উইলিয়ামস সংগীতের ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন, Music is the Art or science of singing with music and dancing,

it is sung in chorus or harmony..

সংগীত গীতাশাস্ত্র কি বলে ধর্ম নিয়ে। ত্যাগই প্রধান ধর্ম। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, 'গীতা' এই শব্দটি বারবার উচ্চারণ করলে 'ত্যাগী' এই শব্দটি উচ্চারিত হবে। অর্থাৎ ধর্মের প্রথম কথা ত্যাগ স্বীকার করা। ত্যাগ অর্থ কামনা বাসনা ত্যাগ, আসক্তি ত্যাগ। আসক্তি, সুখদুঃখাদি চিত্ত চাঞ্চল্যের কারণ। সংসার আসক্তি ত্যাগ করেও, সংসার করা যায়, বিষয়ে কামনা না করেও বিষয় ভোগ করা যায়, ফল কামনা না করেও কর্ম করা যায় এবং শ্রী গীতার উপদেশ তাই কর্তব্য। কামনাই অর্থের মূল। তাকে শাস্ত্রে হৃদয়গ্রন্থি বলে। আর এই গ্রন্থি ছিন্ন করতে পারলেই মৃত মানুষ অমর হয়ে উঠতে পারে।

ভক্তিপথে সেই মাধ্যম... যে পথে ত্যাগ আছে। শান্তি আছে। ভক্তি পথে এগিয়ে গেলে, একমাত্র তাঁর স্মরণ হলে তার কৃপায় হৃদয় গ্রন্থি ক্রমে শিথিল হয়। জীবন মধুময় হয়। আর এই ভক্তিপথ সুগম হয় সংগীতের মধ্যেই। ঈশ্বর সাধনার শ্রেষ্ঠ উপায়। ঈশ্বরানুভূতি গাঢ় হয়ে ওঠে সংগীত সাধনায়। সংগীতের ধর্ম ভাব যেখানে লুকিয়ে আছে ভক্তি। এই ভক্তি পথেই ঈশ্বর চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ সংগীত সৃষ্টির প্রথম পর্বে যে গান রচনা করেছিলেন তার বেশির ভাগই ছিল ব্রহ্মসংগীত। ভগবত ভাব আশ্রিত গান। শুদ্ধ রাগাশ্রিত গান। যেখানে অলংকরণ নেই। কোনও বাহুল্য নেই। যেমন ইমন রাগে

'হে মোর দেবতা' অথবা বেহাগ রাগে 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে' কিংবা কেদার রাগে 'প্রভু আমারও প্রিয় আমারো' এই গানগুলিতে ঈশ্বরঅনুভূতি প্রাঞ্জল।

রবীন্দ্রযুগে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদগ্ধ যুগান্তকারী কবি, সুরকার এবং সুগায়কের সঙ্গে, তাদের শিল্প সৃষ্টির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে থাকি। অনুভব করলেও এ কথা বলতে আমরা দ্বিধাবোধ করব না যে, তাঁদের সৃষ্টিতে রবীন্দ্র ভাবধারা ও গভীরতা ভীষণভাবে দেখা যায়।

কাজী নজরুল ইসলাম এই সত্যতা নিজের জীবন সাধনায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু রূপেই স্বীকার এবং সম্মান দিয়েছেন। যদিও এই পঞ্চকবির গানের মধ্যে স্বকীয়তা বিরাজ করছে। কিন্তু ভক্তি পথের মধ্যে দিয়েই তাঁরা এগিয়েছেন। সমৃদ্ধ করেছেন সংগীতকে।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের মধ্যে বিন্দু বিন্দু মুক্ত হয়ে দেখা দিয়েছেন অন্তর্যামী। সেখানেও শতদল। বেদনা এবং সৃষ্টির মধ্যে এক সুন্দর সম্পর্ক আছে যে রকম" নৃত্যের তালে তালে হে নটরাজ" এই গানটিতেও নটরাজ মানবের অন্তরাকাশে যে রস সৃজন করছেন, সেখানেও বীনাবাদিনীর মানাসলোক জুড়ে রয়েছে গানটি।

অর্থাৎ রবীন্দ্রগানে বা কবিতায় বারেবারে ঈশ্বর ভাবনার মূল তত্ত্বটি প্রকাশ পেয়েছে। সঙ্গীতের ধর্ম প্রেম, আবার প্রেমের ধর্ম সামঞ্জস্য রক্ষা করা। সঙ্গতি রক্ষা করার মত কঠিন কাজটি সহজেই করে সংগীত। কালে কালে যে সংগীত সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে এসেছে সুর। তার মধ্যে এসেছে লয় এসেছে কবিতা। সৃষ্টি হয়েছে নতুন দিগন্ত। ভাষা।

রবীন্দ্রনাথ সংগীত সৃষ্টির প্রথম পর্বে যে গান রচনা করেছিলেন, তার বেশির ভাগই ছিল ব্রহ্মসংগীত। ভগবত ভাব আশ্রিত গান। শুদ্ধ রাগাশ্রিত গান। যেখানে অলংকরণ নেই। কোনও বাহুল্য নেই। যেমন ইমন রাগে 'হে মোর দেবতা' অথবা বেহাগ রাগে 'তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে' কিংবা কেদার রাগে 'প্রভু আমারও প্রিয় আমারো' এই গানগুল

কাজী নজরুল ইসলাম এই জীবন সাধনায় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথকে কবিগুরু রূপেই স্বীকার এবং সম্মান দিয়েছেন। যদিও এই পঞ্চকবির গানের মধ্যে স্বকীয়তা বিরাজ করছে। কিন্তু ভক্তি পথের মধ্যে দিয়েই তাঁরা এগিয়েছেন। সমৃদ্ধ করেছেন সংগীতকে।

নজরুলের ভক্তিগীতিতে ইসলাম এবং হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শাখার মর্মবাণী একই খাতে প্রবাহিত হতে দেখেছি। সেই কারণে কাজী নজরুল ইসলামকে সর্বধর্মের সমন্বয়কারী সাধক হিসেবেই গণ্য করা হয়। তাঁর দৃষ্টিতে এবং অনুভবে আল্লাহ, কালা কালি একই রূপ পরিগ্রহ করে মনোলোকে অধিষ্ঠান করছেন। দুঃখী মানুষের জীবনকে জ্বালিয়ে চিরজাগ্রত সত্তা এবং সত্যের পথ দেখাতে পারে তাঁর সংগীত। প্রেমের বিভিন্ন অবস্থা, যেমন বিরহ, ব্যর্থতা, আশা-নিরাশা, মিলন এবং মানবিক প্রেমের মধুর জটিলতা তার গানে সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। কিন্তু সমস্ত গানের মধ্যে যে ভাব, যে আবেগ সে তো ভক্তিপথের কথাই বলে, 'আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই বুঝি তাই সকল খানে'।এখানে এই গানটির অন্তরের মধ্যে নিহিত আছে প্রাণের মানুষ, যিনি অন্তর্যামী। অন্তরেই তাঁর বাস অর্থাৎ ঈশ্বরকে খুঁজতে কোথাও যেতে হবে না। তিনি তো মনের মধ্যেই বিরাজ করছেন

সংগীতের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের কথা এসেছে। কখনও হিন্দু ধর্ম, কখনও বা ইসলাম ধর্ম, কখনও বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, এসেছে বৈষ্ণব ধর্ম। আমরা পেয়েছি কৃষ্ণের ভজন। পেয়েছি মীরার ভজন।

লালন ফকিরের আজীবন কেটে গেছে সেই মনের মানুষের খোঁজ করতে করতে। তাঁর জীবনে দর্শনের এক নতুন জোয়ার এনে দিয়েছিল যাতে গা ভাসিয়ে দিয়ে লাভ করেছিলেন পরম পরিতৃপ্তি।

 

 

 

 

 

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন