![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৬ |
কুইয়ার কোড
এ হল গে-মুখবন্ধ। ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণে ভাঙনের সম্ভাবনা তার ভেতরে প্রথম থেকেই মজুত ও সক্রিয় থাকে,- অস্পষ্ট, অনির্ধারিত,- নামহীন, অবাঞ্ছিত, বাবা-মা’র অবহেলা, অত্যাচার, প্রতিবেশী, সহপাঠীদের উপহাস, তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, তিনবছর পেরোতেই- মা, তাঁর শাশুড়ির কাছে, “বংশের ধারা” শুনে- অনির্বাণকে ফেলে চলে গেল। স্কুলের কেরানি গোকুল স্যার একদিন ছুটির পর, তখন ক্লাস সিক্স, বয়সের তুলনায় কচি ও কোমল, অনির্বাণকে আটকে বলে, “এই প্যান্টটা খোল তো, বাহ্, বেশ নরম নরম! … হুম্… বুঝলাম, ঘুরে দাঁড়া; এই ছাগী, হেগে ছুঁচিস?” ‘নরম নরম’ কথাটা শুনেই আতঙ্কে কাঁপে অনির্বাণ, “হ্যাঁ”, বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলল। “চুপ, চুপ, কাল সাবান দিয়ে আসবি, সোনপাপড়ি দেব, কাউকে বললে স্কুল বন্ধ্, মেইচা একটা”।
যে কার “মেইচা”। খেলনা-বাটির পুতুলভাব সংসার, অনির্বাণ নিজেই পুতুলতুল ভাব, অতি সংগোপনে,- সাধারণত ঘরে চৌকি আর দেয়ালের মাঝে এক নিভৃত ও নিরাপদ আশ্রয় তৈরি হয়- সেই তার সংসা্র,- যা কিছু। ধীরে ধীরে পারস্পরিক সম্পর্কের চিরাচরিত বন্ধন, মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা,- ফাঁপা সংস্কার ছাড়া কিছু নয়, বুঝতে পারছিল। বাধ্যবাধকতা ও আকর্ষণ ক্রমশ শিথিল এবং ভঙ্গুর হয়ে উঠছিল, ভেতরের 'সে' এবং বাইরের 'সে'-র ব্যবধান কমে আসছিল, ভেতর তার,- দ্বিধার খোলস ভেঙে বাইরের তার’এর কাঠামো প্রত্যাখ্যানের দিকে আরও বেশি বেশি ঝুঁকে পরছিল। বাড়ির সদস্য ও অভিভাবকস্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলার চেষ্টায় আনুগত্যের কোন অভাব না থাকা সত্ত্বেও, এই ঝোঁককে তার অন্তরসত্তার বৃহত্তম অংশীদারের মান্যতা দিতে বাধ্য হয়েছিল, পরিধি সংকুচিত হচ্ছিল, কেন্দ্রবিন্দু তার ভার বহনে অক্ষম, নিয়ন্ত্রনের দড়ি তার খুঁটি উপড়ে ফেলেছে, এমন এক মধ্য বৈশাখের, আসন্ন সন্ধ্যায়,- অনির্বাণ,- আশিবা গৌতমী এক পথভ্রষ্ট উল্কাপিণ্ডের মতো, ভেঙে চুরমার হয়ে রাস্তায় ছড়ানো, অগণিত তাদের মুখ, নামহীন দ্বীপের অচেনা বাসিন্দা, এই পৃথিবীর মৃত,- হৃদয়হীন মানুষের ভিড়ে, অন্য পাঁচজনের মতো নয় — যেন এক বিশেষ উপজাতির কেউ,- মিশে গেল।
বাম বাহুমূলে ডেলটয়েড পেশীর উপর, গাঢ় নীল ট্যাটু, গর্ভস্থ শিশুর ঘুমের বৃত্ত, অবধূতের কুইয়ার কোড, অনির্ধারিত উপনিবেশের নাগরিকত্ব, দৈনন্দিন বৈশিষ্টগুলির সাথে অসংগতিপূর্ণ নিজেদের অচেনা সত্তার পঞ্জিকরণের অপেক্ষায় আশিবা গৌতমীর জন্য অস্থির, এসময় যদি কোন অসম্ভব দ্রুত বাইক, দানবীয় ক্রেনগাড়ির সামনে আচমকা পড়ে যায়, ভবিতব্য হয়ে পড়ে অস্পষ্ট, বাইকটা তখন একটা ‘সাবধান, সামনে হসপিটাল’ বোর্ডের সামনে, অবধূত সতর্ক ও ব্যস্ত, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অদম্য ও মরিয়া হয়ে পড়েছিল, দক্ষতার ওপর যদিও তার আত্মবিশ্বাস সন্দেহাতীত - চেষ্টা করেও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা আড়াল করতে পারেনি,- কেন্দ্রীয় দপ্তরের দিকে যাবার প্রধান সড়ক তিন নম্বর গেটের সামনে, গাড়ি এগোনো অসম্ভব- এমনকি সেখানেও (অনিয়ন্ত্রিত…)!
আশিবা গৌতমী, মানুষের জটলা্য় তার ভয়, আর ভিড়ের ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে, আশিবা গৌতমী, ৯১২৫৩৩৭৫৫১, ফরচুন মল, বিকেল চারটে থেকে পাঁচটা…! বাড়ির লোক অথবা এমন কেউ আছেন, যিনি চেনেন? আশিবার খুব শীত পেল, মধ্য বৈশাখেও।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন