বর্ণমালার সাতকাহন (পর্ব ৩৬)
আমার শাশুড়ি আমাকে 'বউ' বলে ডাকতেন।
শ্বশুরের ইচ্ছে ছিলো পুত্রবধু পায়ে নূপুর পরে গুনগুন গান গেয়ে এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াবে।
জীবন অনেক এবসার্ড স্বপ্ন দেখায় হয়ত তার বীজ বোনা ছিলো পরম্পরায়। তেমন কোনও পটভূমি
ছিলো না যুদ্ধক্ষেত্রে। তেমন কোনও যুদ্ধ বিরতিও ছিলো না। ঝরে ঝরে পড়া সাতমহলা বাড়ির
দুটি ক্ষয়িষ্ণু মানুষ ক্রমে মরে যেতে লাগলেন প্রতিদিন। তেমন কোনও লক্ষ্ণীমন্ত ছিলো
না তাদের অষ্টাদশী বালিকাবধূটি। জেদি এবং ক্রোধী গনগনে আঁচের মতো মেয়েটি তখন দাউদাউ
আগুনের ভেতরে নিজেই দাঁড়িয়ে রুক্ষ পৃথিবীতে। সংসারে যখন ন্যুনতম শ্রী থাকে না। খানিকটা
আপেক্ষিক হলেও যখন বাড়ির পুরুষদের কর্তব্যবোধ থাকে না সংসারের প্রতি তখন সবচেয়ে বেশি
মূল্য দিতে হয় বাড়ির মেয়েমানুষটিকে। আজ জগত ভেসে গেছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিরসে,
লেখা হয়েছে পুঁথি শত শত। কিন্তু বিষ্ণুপ্রিয়া হয়ে গেছেন কীর্তনে ক্যাথারসিস হিসেবে।
বিষ্ণুপ্রিয়ার কাছে তো চৈতন্য নয়, তিনি স্বামী। পুরুষ। তাঁর নষ্ট সংসার নিয়ে কটা
কথা? একজন নারী একজন স্ত্রীর আশা আকাঙ্ক্ষা জৈবিক চাহিদার কথা কেউ ভাবেনি। কোল্যাটারাল
ড্যামেজের ভার শুধু মেয়েদের কেন? পরে দেখেছি সংসারে একজন স্বামী সামান্য রোজগার করেন
বা করেন না। সারা জীবন ট্রেড ইউনিয়ন করছেন, আদর্শবাদ করছেন পার্টি অফিসে বসে, একের
পর এক বিড়ির ধোঁয়া লাংস নষ্ট করে দিচ্ছে আর তার মেধাবী পুত্রটি বিনা শাসনে বিনা নজরে
বিপথগামী। যে কম্যুনিস্ট পিতার কাছে দারিদ্র্য গর্বের তার সন্তানের কাছেই অর্থলিপ্সা
এবং অসৎ পথ টেনেছিলো। যাঁতাকলে পিষে যেতে থেকেছে সংসারের লক্ষ্মী! আমার পরমা সুন্দরী
শাশুড়ি তাঁর সমস্ত ক্ষোভ এবং ফ্রাস্ট্রেশন ঢেলে দিতেন আমার ওপর প্রাথমিকভাবে। সে বোঝার
বয়স বা অভিজ্ঞতা আমার ছিলো না তবে তার দায় আমারও ছিলো। আমি সাচ্ছন্দ্যে উজ্জ্বলতায়
বড়ো হয়েছি। জীবনের ধূসর পর্ব নিজে আহ্বান করেছি। মায়ের পুত্র প্রীতি, বাড়ন্ত মেয়ের
প্রতি অমনোযোগ নিয়ে একরাশ কাঁচা অভিমানে মাকে ছেড়ে গিয়ে তাঁকে কষ্ট দিতে চেয়েছি
নিজে বিষপান করে,"নিয়তি অলক্ষ্যে হাসিলেন!" তেমনি শাশুড়ির সঙ্গে এক দুবার মেজাজ হারিয়ে সেই আগুন বালিকা বেলায়
চরম ব্যবহার করে ফেলেছি। আজও ভেবে মন সংকুচিত হয়ে যায়। এক দুপুরে যিনি অভুক্ত বাইশ
বছরের একমাত্র পুত্র বধূটিকে অনাহারে রেখে হাঁড়ি আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন
কয়েক মাসের ভেতর ছায়া স্থান পরিবর্তন করল। দৃশ্য পাল্টে গেলো এবং অন্তিম শ্বাস অবধি
হয়ে গেলেন বউএর জন্য চক্ষে হারা হয়ে। জীবন অদ্ভুত আবর্ত।
"প্রবৃত্তি অবিচ্ছেদ্য কারাগারে
বন্দী করি রয়েছে আমায়--
যে যার নিজের মত ভেবে নিয়ে ওরা
আজ একা একা বেঁচে আছে ছোটো ছোটো আকাশের নিচে।"
মুর্শিদাবাদের কোর্টের মোক্তার
ছিলেন এই বংশের যে পুরুষ তাঁর পুত্র অর্থাৎ আমার শ্বশুরবাবা ছিলেন পরাধীন ভারতে একজন
চাটার্ড একাউন্টান্ট, ভারতীয় রেল কোম্পানির বোর্ডের সদস্য। এঁদের বাস ছিল লক্ষ্ণৌ
যেখানে জ্ঞাতি পরিজনেরা লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন অধিকাংশই। যাইহোক, পরীক্ষায়
পাশ আর সংসার তরণীকে ভরাডুবি থেকে রক্ষা করতে করতে কোমল আর লাবণ্য দুই বোন ধূসর আকাশে
বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেলো। তাঁরা চলে গেলেন নূপুরের স্বপ্ন দেখে। রাশিয়ার চিঠি, শত লিফলেট
বাম পার্টির কাগজপত্র চটি বই সেগুন কাঠের পালঙ্ক সব চলে গেলো। বাস্তব নিপীড়িত তুচ্ছ
এক সৈনিকের ছোটো তাঁবুতে ওসব অলংকারের স্থান কই। কষ্ট। কষ্টের অনুভূতির সন্ত্রাস সেই
শুরু। ওই সময় লেখালিখি চলছিল হিউম্যান রাইটসএর নানা কাগজপত্রে। এলিস গর্গ এর জীবন
নিয়ে, নারী নিগ্রহের বিষয়ের ভারতীয় ধারাগুলি নিয়ে, অরুন্ধতী রায়ের গ্রন্থের অনুবাদে...
জীবন থেকে কাব্যলক্ষ্ণী সাময়িক মুখ ফেরালেন। ঘর থেকে অন্য ঘর। বাড়ি পাল্টে গেলো।
পরিবর্তন জীবনের রীতি। "but I being poor have only my dreams,
I have spread my dreams under
your feet
Tread softly,for you tread on
my dreams.(W.B.Yeats)
ছেলেমেয়ে চাকরি সংসার ... বিধাতা
বলবে আর কি চাও? যদি সত্যিই এভাবে বৃত্ত সম্পূর্ণ হতো! ঘরের ভেতর সংঘাত ঘরের বাইরে
নিঃশব্দ সংঘর্ষ জীবন সাগরের তুফানের ভেতর ফুটো নৌকো নিয়ে জার্নি একের পর এক দেখে যাই
অনাবিস্কৃত দ্বীপ। বহুদূরের অক্ষরেখায় বনানী। দেখেছি কত ঘরে ঘরে সফল দাম্পত্য শীতল
গ্লেসিয়ার হয়ে আছে। কত নারীদের মন সকালে স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠে তৈরি হচ্ছে রোজকার
বাক্যবাণ আর হেনস্থার। ফাঁকা বাড়ি ডেকে আনে যাবতীয় শোক, হারানো কথা।বৃষ্টি হয়। ঠিক
কী চাই তা অস্পষ্ট কুয়াশার ভেতর থেকে হাতছানি দেয়। ঠিক মৃত্যুর মতো আকর্ষণীয়ভাবে।
প্রেম। একমাত্র প্রেম পারে মানুষকে
বাঁচিয়ে তুলতে। প্রেম যা মরে যাওয়া মন অমোঘ শক্তিতে মোটিভেট করে অবশ শরীর। প্রেম
এক মহাজাগতিক মানসিক অবস্থার নাম। সেই প্রেম হতে পারে কোনও assume করে নেওয়া সুপারম্যানের
প্রতি নিবেদন যা আত্মরতির নামান্তর। প্রেম একটা আফিমের নেশা। প্রকৃতিপ্রেম পশুপ্রেম
বা ... মানুষের প্রতি প্রেম ধূসর মরুভূমিতে সবুজ বিপ্লব নিয়ে আসে। ভালোবাসার কোনও
বৈধ অবৈধ নেই বহু মানুষ বললেও, জগতের মন্দিরে মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণ পুজিত হলেও সংসার
প্রেমের বিষয়ে খুঁতখুঁতে আজও। যা স্বাভাবিক তাকে জোর করে চাপা দিলে তৈরি হয় জটিল
ঊর্ণনাভ। প্রেমের কোনও সময় অসময় নেই। আমাদের সমাজ খুন জখম হিংস্রতা নিয়ে যত সহনশীল
ভালোবাসার ব্যাপারে ততটাই অসহিষ্ণু। অবশ্য মোহ আর প্রেম এক নয়। প্রেম দীর্ঘ স্থায়ী।
সে ঈশ্বর বিশ্বাসী আত্মপূজন হোক বা নর নারীর প্রেম হোক। চারটে নকুলদানা আর দুটো ধূপ
জ্বেলে দিলেই যেমন ভগবতপ্রেম হয় না কয়েকবার শোয়া বসা করলে সেটাও প্রেম হয় না। প্রেম
সেটাই যা দগ্ধ হবার পরেও একই থাকে। আবার আমাদের সমাজের চিরাচরিত একটা ভুল ধারণা জেনেশুনে
প্রচারিত হয়ে থাকে, শরীরের প্রেম খুব নিন্দনীয় বর্জনীয়। প্রেম তো শরীর থেকেই উৎসারিত।
শরীর বিনা প্রেম হয় না। যে শরীর ইঞ্চি ইঞ্চি চেনা হয়নি সেখানে আসক্তি সেখানে আনুগত্য
কিসে? একটা জীবনে একাধিক সত্য প্রেম আসতে পারেই, বহু নয়। যে মন শূন্য হয়ে আছে সেই
অক্ষরেখায় সমুদ্র থেকে লোনা বাতাসের আগমনের সম্ভাবনা জেগে থাকে। বিরহের স্বাদ পেয়ে
ভিজে ভিজে যেতে বৃষ্টিতে। জীবনের মতো সেই প্রেম দীর্ঘায়ু বা স্বল্পায়ু হতে পারে,
তবু প্রেম এসেছিল হৃদয় বাতাসে যেভাবে আবার ছন্দে ফেরা যেভাবে বৃষ্টি এলো--
"কী তোমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয়মাঝে নাহি জানি কী যে
বাজে
নিশিদিন নীরব সঙ্গীতে
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতোন।
এ যে সখী হৃদয়ের প্রেম
সুখ দুঃখ বেদনার। আদি অন্ত নাহি
যার
চির দৈন্য চিরপূর্ণ হেম।
নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবারাতে
তাই আমি নাহি পারি বুঝাতে।"
যেভাবে আবার সকাল হয় অনিবার্যভাবে
সেভাবেই হঠাৎই আমার দরজায় টোকা দিলো প্রেম। সুর্য মাথার ওপর ততদিনে। উড়িয়ে দিল ধুলো
ময়লা যা কিছু জমা ছিলো ঘরে। প্রেম জীবনকে ফের জীবন দিলো। সে কথা পরে।
(ক্রমশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন