![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৪ |
আমবনীর ধোঁয়া
বারান্দা সংলগ্ন ঘর, যেখানে একটা মোটা কাঁথার উপর অয়েলক্লথ পেতে আমবনী তক্তাপোশে শুয়ে থাকবে, লাগোয়া ফণী সাহার বাগান, যেখানে কাঁঠাল পাতার ঘুলঘুলি দিয়ে নেমে আসা বিকেলের গায়ে হলুদ গন্ধ পাবে জনাই। পাকা কাঁঠালের কোয়ারা যেন ইতস্তত ক্রীড়ারত, “বাতাসে আলো সরে সরে যায়, তাই বুঝি এমনতর,” এ কথা যেই ভাবা, জনাই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। কে যেন তার কানে কানে বলে, পাতা ও বিবিধ আগাছা এই মধুর ইত্যাদির ওপর দেহ রাখো হে জনাই! নিস্তেজ দেহে বুনো নীল মাছিরা জড়ো হবে, ডেঁয়ো পিঁপড়ের দল একে একে নির্ভয়ে জনাইয়ের পর্যুদস্ত দেহলীতে থিতু হবে, যেহেতু এ হেন বেহুঁশ জনাই কিন্তু আদতে বিষ কামড়ের ঠেলায়, তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবার সকল প্রচেষ্টা তার ব্যর্থ হল, আবার শয্যাগত হল। জনাই যথাসাধ্য কালো তদুপরি কর্কশ, তার বউ পারানি সাধারণত বাপের বাড়ি থাকে, ফলে সে বেলা দুটোয় জনশূন্য ঘরে ফিরে ভাঙাচোরা সাইকেল রিক্সাটাকে উঠোনের কুলগাছে বেঁধে সামসেরের দোকান থেকে মুড়ি-চানাচুর, এক পলা তেল, একটা পেঁয়াজ নিয়ে রেললাইনের ধারে মিনতির চোলাই-ঠেকে আকণ্ঠ গিলে “পাতার ঘুলঘুলি দিয়ে নেমে আসা বিকেলের গায়ে হলুদগন্ধ”-এর নিচে আশ্রয় নেবে। জানলার দিকে তাকিয়ে নির্বাপণ জনাইয়ের সেই “যথাসাধ্য কালো তদুপরি কর্কশ” মুখটা দেখার চেষ্টা করল। যদিও আবছা সন্ধ্যের আলোয় - এখন যেহেতু রাত দশটা - ঠাওর করতে পারল না। নির্বাপণ আর একবার লাইন কটার ওপর চোখ বুলিয়ে নেয়, একটা বিষণ্ণ হাই তোলে, এ কারণে যে, তার চোখ ভারি হয়ে আসছে … সে লেখক হতে চায়, এবং যখন লেখার অবসর পায় লেখে, অন্তত জনাই না ফেরা পর্যন্ত, তখন এগারোটা বেজে যায়, জানলার নিচের রোঁয়া ওঠা গলিতে ঘেঁয়ো কুকুরের গলা, জনাই মাতালের উচ্চস্বরে গানের পিছনে ধাওয়া করবে, রিক্সার চাকা ও অসমতল পথের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিষণ্ণ হাই, ভারি চোখের পাতার নিচে একটা বাতিদন্ডের আলোর অসুখ দেখা দেয় নির্বাপণের, বিয়ের তিন বছরের মাথায়, ভেজা মেঝেতে আছাড় খেয়ে বাঁদিকের কোমড় ও হাঁটুর চোট আমবনীকে একপ্রকার অকেজো, অস্থির ও খিটখিটে করে তোলার পর থেকে - দু-বছর ধরে নির্বাপণ একই পাণ্ডুলিপির সংস্কার ও সংশোধন করে চলেছে, সেই একই বাতিদণ্ডের আলোর অসুখ - তার সারা দেহে প্রবাহিত - কবে, কোথায় গিয়ে শেষ হবে সে জানে না। বরং তক্তাপোষ থেকে পড়ে আমবনীর আর একবার অ্যাক্সিডেন্ট হোক যাতে জনাই ও তার যথার্থ সুন্দরী বউ পারানি নির্বাপণকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে। লেখায় একটা পরকীয়া ক্ল্যাইমেক্স-এর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবার সুযোগ, নির্বাপণের - কিন্তু জনাই আর তার বউ রাজি হয় না। আর কোন উপায় না পেয়ে - একদিন সকালে আমবনীকে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখল নির্বাপণ। সে তাই লিখেছিল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন