রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

স্বর্গ এসেছে নেমে



(১০)  

ফাইনাল ইয়ারের অন্তিম পর্বের পরীক্ষা। অনঙ্গবাবু আর মনস্বিনী, দু’জনেরই বিশ্বাস বৈশ্বানর আগের পরীক্ষাগুলোর মত এই পরীক্ষাতেও সফল হবে এবং আবার খবরের কাগজের শিরোনামে জ্বলজ্বল করবে তার নাম। পরীক্ষা প্রস্তুতির ব্যাপারে জানতে চাইলে বিনীতভাবে বলেছিল বৈশ্বানর, তার সান্যাল কাকুর মর্যাদা সে ক্ষুণ্ণ হতে দেবে না কোনমতে। এই মনোবলকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিল মনস্বিনী, প্রকৃত যোদ্ধার মত কথা, এত বাধার পাহাড়কে অতিক্রম করে যে নিশ্চিত জয়ের কথা বলতে পারে তার বীরত্বকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় আছে?

পরীক্ষার দিনটি এল অবশেষে। মনস্বিনীর মনে হল এই দিনটিতে মাকে বিশেষ ভাবে মনে পড়বে বৈশ্বানরের। পরীক্ষা দিতে যাবার আগে মায়েরা সন্তানদের কপালে মঙ্গলসূচক দইয়ের ফোঁটা পরিয়ে দেন। মা কাছে নেই বলে তা থেকে বঞ্চিত হবে কেন বৈশ্বানর? মঙ্গলচিহ্ন তো যে কেউ এঁকে দিতে পারে। ভাবনা অনুযায়ী একবাটি দৈ আর চন্দন নিয়ে হাজির হল মনস্বিনী বৈশ্বানরের ঘরে। কপালে দইচন্দনের ফোঁটা দিয়ে বলেছিল, ‘আমি জানি, আমার মঙ্গল কামনা বৃথা যাবে না’। হেসে বলেছিল বৈশ্বানর, ‘ভাগ্যের সাধ্য কি এই মঙ্গল কামনার বিরোধিতা করে’! প্রতিদিন পরীক্ষার পর বৈশ্বানরের হাসি মুখটি না  দেখা পর্যন্ত অস্থির হয়ে থাকত মনস্বিনী। হাসিমুখে ফিরেছে বৈশ্বানর, তার মানেই হল পরীক্ষা ভাল হয়েছে। শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে ফিরে আসার পর জানতে চেয়েছিলেন অনঙ্গবাবু ফার্ষ্টক্লাস হবে কিনা। মনে অপরাধ বোধের বিরাট একটা বোঝা বয়ে বেড়াতেন তিনি। আশ্রিত ছাত্ররা তাঁরই ভরসায় নির্ভয়ে থাকে তাঁরই আশ্রয়ে। তাদের কোনরকম ক্ষতির দায়ভার তো তাঁকেই নিতে হবে, বিশেষ করে ক্ষতির কারণ যখন তাঁরই পরিবারের কারও অবিমৃশ্যতার ফল। একটা  প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে যখন হাসিমুখে বলল বৈশ্বানর, ‘হবে কাকু’, তখনই মনে হল যেন মনের দিক থেকে পুরোপুরি হালকা হয়ে গেলেন তিনি। বৈশ্বানরের মধ্য দিয়েই তার নিজের জীবনের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা দেখতে চান অনঙ্গ সান্যাল। জানতে চাইলেন, এরপর কী পদক্ষেপ নিতে চায় বৈশ্বানর। বিনীত জবাব এল, পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করতে চায় সে। মনে মনে ভাবলেন অনঙ্গ, পুলিশী ব্যবস্থার যে হাল  বর্তমানে, সেখানে বৈশ্বানরের মত আদর্শবান অথচ সাহসী ছেলের প্রয়োজন রয়েছে দেশে। তিনি উৎসাহিত করলেন বৈশ্বানরকে এবং জানালেন যা খরচ হবে ষ্টাডির জন্য তা বহন করবেন তিনি, বৈশ্বানর যেন কোনরকম সংকোচ বোধ না করে। বিনীতভাবে জানালো বৈশ্বানর, তেমন কিছু খরচ নেই। কলেজ লাইব্রেরি থেকে প্রয়োজনীয় বই পত্তর জোগাড় করে সে প্রস্তুতি প্রায় সেরেই ফেলেছে। অনঙ্গবাবু আশ্বস্ত হলেন শুনে।

এদিকে মনস্বিনীর পরীক্ষাও দোরগোড়ায়। বৈশ্বানর একদিন কথাচ্ছলে বলল মনস্বিনীকে, ‘আমাকে তো পড়ালেন, আপনার নিজের পড়া’? সহজ জবাব মনস্বিনীর, ‘আমি অতখানি উদার নই বৈশ্বানর, যে নিজের ক্ষতি করে কারও উপকার করতে যাব’। বৈশ্বানর মৃদু হাসল একটু, তারপরেই বলল তার আশঙ্কার কথা, ’আমি তো আর কলেজে থাকছি না, রেজাল্ট বেরোলে পরীক্ষা দিয়ে হয়তো পুলিশ সার্ভিসে জয়েন করবো, তখন কিন্তু আপনাকে খুব অ্যলার্ট থাকতে হবে’। মনেই হল না মনস্বিনী এ ব্যাপারটায় খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে। মনস্বিনীর অনায়াস উত্তর, ‘কলেজে আপনার না থাকাটা ম্যাটার করে বৈকি, তবে ওদের আমি ভয় পাই না, যারা দলবাজি করে তাদের মেরুদন্ড বলে কিছু থাকে না, এটা আমার বিশ্বাস’। ‘আপনার বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়েই বলছি, মেরুদন্ডহীনরাই কিন্তু অনেক বেশী বিপদজনক’, মনস্বিনীর কথার প্রেক্ষিতে বলল বৈশ্বানর। মনস্বিনীর চোখে জিজ্ঞাসা। আগের প্রসঙ্গের খেই ধরেই বলল বৈশ্বানর, ’কারণ দল ওদের যেমন খুশী ব্যবহার করতে পারে, আবার ওদের মদত পাবার জন্য যে কোন কুকীর্তিকে ধামা চাপাও দিতে পারে। আপনি  ওদের বিরোধিতা করেছেন সে কথা লিখে রেখেছে ওরা, সুযোগ বুঝে ছোবল মারবেই। মিটিং-এর সময়ে যে দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল রুদ্রাক্ষ  তাতে প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছু  লেখা ছিল না। নির্ভিক কন্ঠ মনস্বিনীর, ‘আর তো মাত্র একটা বছর, তারপর ল’ পড়ে উকিল আর তারপর বুঝবে ওরা পানিশমেন্ট কাকে বলে’। যেন সচেতন করে দেবার  জন্যই বলল বৈশ্বানর, ‘সেও তো কম দিনের কথা নয়, তিনটি বছর তো বটেই, চাকরী পেলে আমার পোস্টিং কোথায় হবে জানি না, বেঙ্গলে কোথাও হলে তো আমিই ওদের সামলে নেবো’। মনস্বিনীর কথায় তাচ্ছিল্য, ‘আগে ভোটে জিতে আসুক তো ওরা, যে সুনাম অর্জন করেছে এতদিনে, মনে হয় না জনগণ আবার ফিরিয়ে আনবে ওদের’। আজ অনেক কথা বলছে বৈশ্বানর মনস্বিনীর সঙ্গে। কেন এত কথা, জানে না বৈশ্বানর। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মনস্বিনীর সাথে যে কেউ কথা বলে আনন্দ পায়। ওর মানসিক দৃঢ়তায় মুগ্ধ বৈশ্বানর। এটাই কি কারণ? নিজেকে প্রশ্ন করে বৈশ্বানর কিন্ত জুৎসই জবাব মেলে না কোন।

পরীক্ষার পর দু’দিন কেটে গেল। মাকে দেখার জন্য আনচান করে উঠল বৈশ্বানরের মন। অনঙ্গ সান্যালকে ইচ্ছের কথা বলতেই তিনি রাজী হয়ে গেলেন। বললেন, তাঁরও মান্থলি ভিজিটের সময় হয়ে গেছে, তিনিও যাবেন গাঁয়ে। মনস্বিনী বলল বাবাকে, সেও যেতে চায় তাদের সঙ্গে। কথাটা কানে যেতেই গর্জে উঠল কুন্তলা। বাবা মেয়ে দু’জনকেই উদ্দেশ্য করে বলল সে, ‘আমি চুপ করে থাকলেই ভেবো না আমি কিছুই লক্ষ্য রাখছি না। যার গাঁ যার বাড়ি সে যাক, আমার মেয়ে যাবে না’। মেয়েও গোঁ ধরে বসল, যাবেই সে। তার যুক্তি, তার পূর্বপুরুষের গ্রাম, সেখানে নিজের বাড়ি রয়েছে তার, সেখানে যাবে সে নিজ অধিকারে। মনস্বিনী জানে মায়ের ভয়ের কারণ। অবুঝ মাকে কী করে বোঝাবে সে, তার জন্য সমাজ রাষ্ট্র এমন কি পুরো পৃথিবীটাই অপেক্ষা করে আছে, বিয়ে করে সংসারী হবার জন্য জন্ম নয় তার। মায়ের সে এক কথা, আগুন ঘি এক জায়গায় থাকলে অঘটন ঘটবেই কিছু। মনস্বিনী ভাবে,  মায়ের এই অমূলক ভাবনাকে যতই প্রশ্রয় দেওয়া হবে ততই সে কঠোরতর হয়ে উঠবে। তাই মায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী মায়ের মাথায় হাত রেখে বলল,  ‘আমি কথা দিলাম মা, তোমার মেয়ে যেমনটি যাবে তেমনটিই ফিরে আসবে, ভয় পেও না’।

(ক্রমশ)

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন