রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

রোমেনা আফরোজ

 

নারী এবং দাসত্ব



(১)

রেনেসাঁ শব্দটা কি শুধু দেশ এবং জাতির বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে, নাকি ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ  করা যেতে পারে? বিষয়টা আমার জানা নেই। তবুও নিজ দায়িত্বে শব্দটাকে আপন বোধোদয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাই। সেই অধিকার নয়বছর যুদ্ধ করে অর্জন করেছি। যুদ্ধটা এখনো অব্যাহত আছে। দশ সাল থেকে একটানা আট বছর ঔষধ গ্রহণ করার পর যখন অ্যাঙজাইটি, ডিপ্রেশনে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছি, তখন স্বভাব ধর্মে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করা একপ্রকার পাগলামি। তারপরেও পরাজয় বরণ না করে, সাহসের সাথে পথ চলছি।

এই তাত্ত্বিক প্রয়োগ নিজেকে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে নয়, এমনকি রেনেসাঁকে হালকাভাবে গ্রহণ করেছি,  তেমনও নয়, বরং সচেতনতাকে সর্বাধিক মূল্যায়িত করার প্রয়াসে এই সংযোজন। তাছাড়া রেনেসাঁর আক্ষরিক অর্থের সাথে আমার বর্তমান অবস্থার যথেষ্ট সঙ্গতি আছে। আঠারো সালে আমার বোধজগতের পুনর্জাগরণ ঘটেছে। অতীত এবং বর্তমান ‘আমি’র মধ্যে রচিত হয়েছে আকাশসমান পার্থক্য। এই পার্থক্য বোধ ও চেতনার।

এই রাজনৈতিক সচেতনতা বা পলিটিকাল কনশাসনেসের পূর্বে আমি ভাবতাম, সরকারি এবং বিরোধী দলের লোকেরা ক্ষমতার প্রয়োজনে রাজনীতি করেন। আমলারাও একই পথের পথিক। তারা শহুরে রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত। গ্রামের চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররাও রাজনৈতিক কারসাজিতে পিছিয়ে নেই। তারাও গ্রাম্য রাজনীতি করেন, যাকে ইংরেজিতে ভিলেজ পলিটিক্স বলা হয়। কিন্তু আমি অজ্ঞাত ছিলাম যে, প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক প্রাণী। সরল ভাষায় বলা যায়, পারিবারিক রাজনীতির যোগফলই হলো রাষ্ট্রের রাজনীতি। সেই হিসেবে পরিবারের সবাই রাজনীতির বিভিন্ন মারপ্যাঁচ অবলম্বন করে থাকেন। এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কেও স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বামী বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কলাকৌশল প্রয়োগ করেন। অথচ জীববিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের পরিপূরক। তারা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ, একে-অপরের সুখ-দুঃখ তারা বন্টন করে নেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, ফলশ্রুতিতে একটা সুন্দর প্রজন্ম গঠিত হয়। সর্বোপরি, সুন্দর প্রজন্ম গঠন করার লক্ষ্যেই মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, এমন ধারণা নিয়ে সংসারে পা রেখেছিলাম।

আমাকে কেউ জানায়নি, সংসারও রাজনীতির মাঠ, সেই মাঠে আমিও একজন খেলোয়ার। ইচ্ছের বিরুদ্ধে  আমাকেও সেখানে খেলতে হবে। বাস্তবতা অজ্ঞাত ছিল বলে, দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত স্বপ্নে মোহিত ছিলাম। তাই সংসারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারিনি, কলা-কৌশলের দিক দিয়ে বারবার হেরে যাচ্ছিলাম। আমার পিঠে বেতাল ভূতের মতো চেপে বসেছিল হতাশা এবং বিষণ্ণতা। আমি অবরুদ্ধভাবে বেঁচেছিলাম। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে একটা সুতোর শেষপ্রান্তে ঝুলছিলাম। আমার দেবতা সংসার নামক রাজনীতির মাঠে চৌদ্দ বছর একলা খেলেছেন। একলাই গোল দিয়েছেন। আমি খেলা দেখতে বাধ্য হলেও দর্শক হিসেবে হাততালি দিতে পারিনি। কারণ জয়-পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে জীবনকে দেখার সক্ষমতা আমার ছিল না। আসলে পারিবারিকভাবে আমাকে দক্ষ সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্ষরজ্ঞান প্রদান করলেও তাতে বোধের জগত গঠিত হয়নি। এজন্য আমাকে বিপুল ভুগতে হয়েছে। এজন্য প্রতিটি বাঙালি নারীকে ভুগতে হয়।

(২)

বিবাহিত জীবনে আমাকে যে-বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে কিংবা এখন পর্যন্ত যে-বিরামহীন যুদ্ধ অব্যাহত আছে, তার কারণ পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমার মায়ের মধ্যে ‘নির্ভরশীল ব্যক্তিত্বের ব্যাধি’ (Dependent Personality Disorder) এবং বাবার মধ্যে ‘পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক গতিবিদ্যা’র (Patriarchal family dynamics) সমস্যা ছিল, যা আমার পুরো জীবনকে প্রভাবিত করেছে। যেহেতু সুস্থ মানুষ গড়ার জন্য পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই অভিভাবককে সর্বপ্রথম পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় শিশুর মধ্যে তৈরি হয় সংকট এবং তা আজীবন লাশের মতো কাঁধে বয়ে বেড়াতে হয়। আমার মধ্যেও বিপুল সংকট ওঁত পেতে ছিল।

আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে একবারের জন্যও আলো-বাতাস দেওয়া হয়নি। অবশ্য তখন পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ ছিল না। চারপাশের সবাই বলতো, মেধা কম। মনোযোগ কমকে মেধা কম বলে প্রচার করায়, আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি। অথচ বর্তমান মানসিক শক্তি দেখে বেশ বুঝতে পারি, তখন উৎসাহ পেলে ঠিকই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতাম।

(৩)

এসব ব্যক্তিগত ঘটনা তুলে ধরার কারণ একজন বাঙালি নারীর স্বপ্নের প্রতিবন্ধকতার মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করা। ছোটবেলা থেকে আমার ব্যক্তিগত স্বপ্নকে হত্যা করে, সংসারের স্বপ্নকে প্রধান করে তোলা হয়েছে, যেন এটাই নারীর একমাত্র ধর্ম। এখানে তর্ক উঠতে পারে, নারীর প্রধান কাজ সংসার এবং সন্তান লালন-পালন করা। এ কথা মূলত নারী প্রজাতিকে সংসারের বেড়াজালে বন্দি করে রাখার জন্য বলা হয়। এখানেই ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি, বরং প্রতিদিন এসব কথা টেপরেকর্ডারে বাজানো হয়, যাতে নারীরা বৃত্তের বাইরে পদার্পণ করতে না পারে। জোসেফ গোয়েবলস বলেছিলেন, মিথ্যাকে বারবার বলা হলে তা সত্যের মতো শোনায়। তাই নারীরাও সংসারের স্বপ্নকেই একমাত্র সত্য বলে ধরে নেয় এবং তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় না। এই অবচেতন মনে সেট করা প্রোগ্রাম জন্মজন্মান্তর ধরে চলে আসছে। যদি আমার বক্তব্য ভুল হতো, তবে নারীও পুরুষের মতো একইরকম মানসিক শক্তিতে উন্নত হতো। কিন্তু পুরুষরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, নারীর মানসিক উচ্চতা পুরুষের মতো নয়। এই বিভেদের দায় শুধু নারী প্রজাতির একার নয়। জন্মলগ্ন থেকে নারীর পক্ষে যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা নারীর মনোজগত তৈরির লক্ষ্যে ন্যূনতম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। উল্টো তারা এমন সব কলা-কৌশল অবলম্বন করেন, যাতে তারা সারাজীবন অধস্তন হয়ে থাকতে পারে। রাজনীতিবিদরা যেমন বিপক্ষ দলের দোষ ত্রুটির কথা বলে তাদের কোণঠাসা করে রাখেন, পুরুষরাও একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের দমিয়ে রাখেন। এতে তাদের মনে দাসসুলভ মনোভাব তৈরি হয়।

আমি বিবাহ প্রথা বা সংসারের বিপক্ষে নই। তবে সংসারের স্বপ্নকে মুখ্য করে তোলার হেতু নারীর মধ্যে যে-দাসের স্বভাব এবং জ্ঞানের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে, আমি তার বিপক্ষে। বেগম রোকেয়া তাঁর ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধে বলেছেন: “কোনো রোগীর চিকিৎসা করিতে হইলে প্রথমে রোগের অবস্থা জানা আবশ্যক। তাই অবলাজাতির উন্নতির পথ আবিষ্কার করিবার পূর্বে তাহাদের অবনতির চিত্র দেখাইতে হয়। আমি ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে ভগিনীদিগকে জানাইয়াছি যে, আমাদের একটা রোগ আছে - দাসত্ব”। এই দাসত্ব নারীজাতিকে অন্তঃসারশূন্য প্রাণীতে পরিণত করেছে।

(৪)

একটু মনস্ক হয়ে খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের সমাজের নারী ও পুরুষের মধ্যকার সম্পর্কে কোনো সৌন্দর্য নেই। এদের বহুদূর থেকে দেখলেও স্পষ্ট ধরা পড়ে, এরা সমমনা সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। এদের মধ্যে শাসক এবং শোষিতের সম্পর্ক বিদ্যমান! এই বৈষম্যের জন্য নারী প্রজাতির সাথে সাথে সমাজেরও বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। বৃক্ষ ভালো না হলে যেমন ফল সুমিষ্ট হয় না, তেমনি একজন শিক্ষিত মা ছাড়া সভ্য সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। এখানে শিক্ষিত বলতে শুধু অক্ষরজ্ঞানের কথা বলছি না। যে-শিক্ষা নারীর মধ্যকার শক্তিকে জাগ্রত করে এবং যে-শিক্ষার কারণে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে, আমি সেই শিক্ষার কথা বলছি।

সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, আমাদের দেশে নারীদের শারীরিক অসুখ-বিসুখের চিকিৎসা হলেও মানসিক অসুখকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ সমস্ত শারীরিক সমস্যা মন থেকে তৈরি হয়। মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য নারীর মানসিকতায় বিদ্যমান দাসত্বেরও পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে না। এখানে পরিবর্তনের জন্য মনকে আমলে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে এবং এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

একটা সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য নারীর প্রতি উদার মানসিকতা অর্থাৎ বৈষম্যহীন পরিবার অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিবার হলো সমাজের ভিত্তি। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের সমাজে তেমন আলাপ-আলোচনা নেই। সবাই শুধু রাষ্ট্র নিয়ে ব্যস্ত। এলিট শ্রেণি মূলত সামাজিক শ্রেণি বিভাজনের ক্ষেত্রে পিরামিডের উপর থেকে আরম্ভ করে। আবার মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে কোষ থেকে আরম্ভ করা হয়। অন্যদিকে কার্ল মাক্স পণ্যকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করেছেন। একটা সমাজকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই বিভিন্নমুখী পদ্ধতি চিন্তার কাঠামোকে সামগ্রিক হতে বাধা দেয়। এতে আমাদের চিন্তাশক্তি ভেঙে যায়। ডেভিড বোহম এটাকে চিন্তার বিভাজন (Fragmentation) বলে চিহ্নিত করেছেন। বস্তুত একটা সমাজকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে এলিট শ্রেণি বিভাজন এবং শাসন (Divide and Rule) নীতিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তাই সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোষ অর্থাৎ পরিবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়া, সহযোগিতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা পুরো সমাজকেই প্রভাবিত করবে। তবে মাথায় রাখতে হবে, শুধু রাষ্ট্র এবং পুরুষদের দিক থেকে পরিবর্তন হলেই চলবে না, এজন্য নারীদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন